দমবন্ধ

~কল্যাণী রমা

(১)

ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের বাসায় বারান্দার অনেকটা অংশ ঘিরে ফেলা হয়েছে। ঘুম ভাংছে আমাদের মোরগের কোঁকর কোঁ শব্দে। ব্যাপার কি? দাদুভাই ভাবছে পরিবারের সকলের ফ্রেশ মুরগীর ডিম খাওয়া দরকার। অনেকগুলো মুরগী বারান্দার উপর ঘোরাফেরা করছে। ভুষি খাচ্ছে। মাঝে মাঝে কোথা থেকে যেন শামুক, ঝিনুক আসছে। তারা তাও খাচ্ছে। ঝিনুকের ভিতরের প্রাণটা আমার তখনই দেখা। চামচ দিয়ে কুঁড়ে ঝিনুকের ভিতরটা খেতে দেওয়া হচ্ছে। আর খোলসটা গুঁড়ো করে ভুষির সাথে মিশিয়ে। শামুক ঝিনুক খেলে নাকি ওদের ডিমের খোলা শক্ত হবে। মুরগি পোষা শুধু ডিমের জন্য। শুধু ডিম। পোষা মুরগি তো আর ধরে খাওয়া যায় না। ওরা পুষ্যি। বড় আদরের। কিছু ডিম আবার রেখে দেওয়া হচ্ছে বাচ্চা তুলবার জন্য। ব্যাতিব্যস্ত অবস্থা।

এরকম নানা 'ফিরে চল মাটির টানে' জাতীয় আবেগের ফল স্বরূপ নানা কিছু গজাতেও শুরু করল দাদুভাই এর বাগানে। গ্রাম নয়, ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস। কিন্তু তাতে কি?দাদুভাই এর বাগানে কলাগাছ আছে। কলা খাই। কলাগাছের থোড়, মোচা দিয়ে ঘন্ট বানায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রাঁধুনি আমার দিদা। থোড়ে মুগডালের ছিটা, ঘি। মোচার ঘন্টে চৌকো চৌকো আলু, আতপচাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বাগানে আলু, গাজর, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, বরবটি, পালংশাক - এইসব মামুলি জিনিষ তো আছেই। সেই সাথে আছে গন্ধপাতালির লতা। বড়া বানিয়ে ঘির সাথে খেতে হয়।জীবনের এইসব ছোট ছোট জিভের আনন্দ নেশার মত।

দাদুভাই এর বাগানে অনেকগুলো লেবু গাছ। কাগজি লেবু, গন্ধরাজ লেবু। লেবু খাওয়াই তো শুধু লেবুগাছের কাজ নয়। লেবুর পাতাও নানা কাজে লাগে। আমার বা ছোটবোন শ্যামার কিছু একটা পেট ব্যথা জাতীয় রোগ হলেই দিদার ধারণা হত তার সোনার টুকরা নাতনি দের উপর কারো নজর লেগেছে। তাড়াতাড়ি লেবু পাতায় তেল মাখিয়ে আমাদের পেটে ছুঁইয়ে তা চুলার আগুনে দিত। চূলাও কতরকম দিদার। মাটির খড়ির চূলা। ইলেক্ট্রিক হীটার। সে হীটারের পাশটা যদিও মাটি দিয়ে লেপা। আবার মার ওভেন। চুলার আগুনে লেবুপাতা ফটফট করে ফুটত। দিদা মাথায় ফুঁ দিয়ে বলত, যাও এবার শরীর ঠিক হয়ে যাবে। লেবুপাতা পুড়িয়ে আর মাথায় ফুঁ দিয়ে শরীর ঠিক করে দেওয়া এইসব নাদুস নুদুস তুলতুলে ডাক্তাররা আজ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু লেবুপাতা, সরষের তেল আর আগুনের গন্ধটুকু থেকে গেছে।

(২)

ছেলেবেলায় খুব গাজর খেতে ভালোবাসতাম। এখনকার মত নয় । কমলা রঙের কচি কচি মিষ্টি গাজর যেন মাটির নিচের খনি থেকে উঠে আসত। কিন্তু দাদুভাই মনে হয় বাগানের গাজর গুনে রাখত। কেয়া, পিয়া , আমি, শ্যামা আর অন্যান্য বন্ধুরা মিলে গাজর খেয়ে তাই উপরের সবুজ পাতা আবার মাটিতে গুঁজে রাখতাম। কিন্তু দুই তিন ঘন্টা পর নেতিয়ে যাওয়া পাতা দেখে দাদুভাই-এর সেকি উত্তেজনা! মারতে তো আর পারে না। বকাঝকা দিয়েই মানুষ খরগোশদের শায়েস্তা।

বাগানের আলু তোলা সেও এক দক্ষ যজ্ঞ । আমার মামী আর মামাতো ভাই অয়ন তখন আমাদের সাথে থাকে। অয়নের জন্ম দুবাই-এ। আমাদের এখানে এসে ক্যাম্পাসে আর পিওন কোয়ার্টারের সামনে চড়ে বেড়ানো ছাগল, গরু দেখে আনন্দে আটখানা ও । অয়ন দাদুভাই-এর বাগানে আলু তোলে আর ভাবে মাটি থেকে ডিম তুলছে। টমেটো দেখে টম্মা টম্মা বলে কি চিত্কার তার। দুপুরে টমেটো আর শশা কুচি করে তখন সবসময় বাড়িতে সালাদ করা হতো । দাদুভাই-এর জন্য অবশ্য চাক চাক টমেটো। অয়ন বাবা মার সাথে আমেরিকায় চলে যাবার পর ওর রেখে যাওয়া জামা কাপড়ের গন্ধ শুকত মা। খাওয়ার টেবিলে বসে কত যে অয়নের সেই টম্মা র কথা। সালাদের লেবুর রস আর পিয়াজ কাচা মরিচের ঝাঁঝে নয়, টম্মা শব্দটায় চোখ জলে ভোরে উঠত সবার।

আলু তুলে নানা ভাগে রাখা হত। মাঝারি, বড়, মেজো। আর সবচেয়ে কুচি গুলোর সবচেয়ে নাম ডাক । খোসা সহ দু ভাগ করে মুচমুচে করে ভাজা হবে। ঘি এর সাথে, ঘি এর ছাকার সাথে বা মুশুরির ডালের সাথে খাওয়া হবে। দাদুভাইয়ের বাগানে ছিল বকফুল গাছ। মটরশুটির ফুলকে টেনে ছয় ইঞ্চি মত লম্বা করে দিলে যেমন হবে বকফুল তেমন দেখতে। বুকের কাছে গোলাপি আভা মতো। প্রায় তিরিশ বছর হয়ে গেছে বকফুলের বড়া খাইনা। ছিল সজনে ডাটা র গাছ। শুনলাম বসন্ত কালে সজনে ডাটা খেলে চিকেন পক্স হবে না। আলু ভেঙে আদা কুচি দিয়ে সজনে ডাটার ঝোল করে দিদা। ঘি তো থাকবেই। ঘি ছাড়া দিদার রান্না হয় না।

পেঁপে গাছ, জাম গাছ, আম গাছ - কিছুরই অভাব নেই দাদুভাই এর বাগানে। কিন্তু আমি সবচেয়ে মুগ্দ্ধ হতাম পাটগাছ দেখে। কচি পাটগাছ থেকে মুশুরির ডাল ছিটা দিয়ে শাক হ'ত। কিন্তু তারপর? দাদুভাই চললো পাট গাছ নিয়ে নালার জলে ডুবিয়ে রাখতে। সত্যি সত্যি পচিয়ে নাকি পাট হবে। স্বর্ন তন্তু। সোনার আলোয় পাট এলো ঘরে। দাদুভাই তা থেকে রশি পাকাল।
আমি তো হতবাক।

দৌড় দৌড় দৌড়। এ ঘর থেকে ও ঘর। আমি দৌড়াচ্ছি, শ্যামা দৌড়াচ্ছে। পিছন পিছন বাতের ব্যথা নিয়ে হেলেদুলে নাদুস নুদুস দিদাও। ঘোল মথিয়ে মাখন করেছে। হাতে মাখন লেগে আছে। তা আমাদের মুখে মাখিয়ে দেবে। মুখের চামড়া তুলতুলে হবে। কিন্তু ডলে ডলে মাখন মাখানোর উতপাতে আমরা তটস্থ। দৌড় দৌড় দৌড়।

(৩)

কোলের উপর দুধশাদা কেক নিয়ে বি আর টি সি র বাসে করে ঢাকা থেকে চলেছি রাজশাহী। মাঝে যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে। সকাল সাতটায় রওয়ানা দিয়ে বিকাল পাঁচটা নাগাদ পৌঁছাব। নদীতে ফেরিতে ঘন্টা তিনেক। নদীর পাড়ে ছোট ছোট গ্রাম। কাশফুল ফুটে আছে। জাল ফেলে মাছ ধরছে জেলে। নৌকা ভেসে যাচ্ছে। লাল ছেঁড়া পাল। মাঝে মাঝে শুশুক দেখতে পাচ্ছি। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। হঠাত ঝপাত করে শব্দ। পাড় ভেঙে পড়বার। জল মাটির নিচে চুপিচুপি চলে যায় অনেকদূর। উপর থেকে বোঝাই যায় না। তারপর হঠা
সব শেষ।

ছোট্ট প্রীতম, লিমন মামী, কাজলমামা সবাই সাথে। কেকের গন্ধে আমার জিভে জল। হবে নাই বা কেন? পূর্বাণী হোটেলের কেক। তুলতুলে শাদা তুলার মত কেকের উপরটা। তাতে গোলাপি গোলাপ আর প্যাস্টেল সবুজে পাতা বানানো। হলুদ রঙের ছোট ছোট ফুল। থ্রি ডাইমেনশনাল। যেন সত্যিকারের। কাজলমামা, মামী প্রথম ছেলের প্রথম জন্মদিন প্রীতমের ঠাকুরদা, ঠাম্মার মানে আমার দাদুভাই দিদার কাছে করবে।

রাজশাহী এসে লাল নীল কাগজের শিকল বানালাম আমরা। ঢাকা থেকে আনা ক্রেপ কাগজ দিয়ে দেওয়াল থেকে লম্বা ঝিরিঝিরি। ভাগ্যিস মনে করে কাজলমামা ক্রেপ কাগজ এনেছিল। রাজশাহী তে তখন ক্রেপ কাগজ দেখিনি। আমি তো বিস্ময়ে ক্রেপ কাগজের গায়ে হাত বোলাই। কিভাবে করে এমন? কি ছোট ছোট কুচি কুচি ভাঁজ।

ছোট্ট প্রীতম পড়ল সাদা রঙের ধুতি পাঞ্জাবি। মনে হয় ইন্ডিয়া থেকে আনা হয়েছিল। সাথে ঘন নীল রঙের ভেলভেটের জ্যাকেট। তাতে রুপালি জরির কাজ।

(৪)
সরো, সরো, সরো। গ্যারেজের দরজা খুলে ঘরের ভিতর দুটো চার ফুট বাই চার ফুট কাঠের তক্তা ঢুকছে। গেল গেল, ধর ধর। লাল আর তাথৈ কাঠের ভারে প্রায় মাটিতে নুয়ে পড়েছে। আবার দেখি কাঠের তক্তার উপর লাল রঙের বো লাগানো। কি ব্যাপার? এ হচ্ছে আমার জন্মদিনের উপহার।
আহা জন্মদিন! ভাবলে নিজে থেকেই মুখটা হাসি হাসি হয়ে যায়। ছেলেবেলায় কত জন্মদিনই যে করেছে মা। আমাদের বাড়িতে তখন ওভেন ছিল না। তাতে কি? কেরোসিনের স্টোভের উপর তাওয়া দিয়ে তার উপর বালি। লাল সাদা ডানো দুধের হাফ টিনের ভিতর ময়দা, ডিম, চিনি, বেকিং পাউডার দিয়ে বসিয়ে দাও। কিছুক্ষণ পর, ‘হয়েছে, হয়েছে!যেন না হওয়ারই কথা ছিল। তবু অষ্টম আশ্চর্য কেক হয়েছে। অবশ্য আমাদের এই ডানো টিনের কেকের পাশে প্রিয় বন্ধু ইয়াসমিনদের ধবধবে সাদা আইসিং দেওয়া আর তার উপর লাল, নীল, সবুজ, রুপালি টিকটিকির ডিম বসানো কেকদের বড়ই রাজকীয় লাগত। ইয়াসমিনের মা জোনমাসি ব্রিটিশ মহিলা। ওঁনার বানানো কেক স্বর্গীয় তো হবেই।
কেকের সাথে জন্মদিনের প্লেটে থাকত নুডলস্। মা যখন ছোট ছোট চিংড়ি দিত নুডলস্-এ, আহা কী ভালোই যে লাগত। পায়েশ হত। আমার জন্মদিন গরমকালে বলে থাকত রসে টইটম্বুর টুকটুকে লাল তরমুজ। একবার মনে হয় তরমুজের জুস করেও অনেক সুনাম কিনেছিল মা। মাঝে মাঝে দিদা বানাত পাটিশাপটা, নাড়ু বা ছাঁচে গড়া ছানার সন্দেশ। ফুল, মাছ, শঙ্খের মত শেপ। আমার কালোজাম পছন্দ হলেও দাদুভাই-এর কড়া শাসনে দেওয়া হত স্বাস্থ্যকর রসগোল্লা আর শবরি কলা। আমার ঝোলাঝুলিতে কখনো সাগরকলা ওরফে সিঙ্গাপুরী কলাও পাতে পড়েছিল। কিন্তু অত বড়া কলা খাওয়া ঠিক হবে না। ফলে দেওয়া হল অর্ধেক করে। সিঙ্গারা দেওয়া হত না কখনো। দেওয়া হত না লোভনীয় চটপটি। শুধু আমাদের স্বাস্থ্যই তো নয়, আমার সব বন্ধুদের স্বাস্থ্যরক্ষার দায়িত্বও যেন দাদুভাই আর দিদার। এখনো মনে পড়ে সব সময় ভালো খাবার যোগারে ব্যতিব্যস্ত দাদুভাই ফিরছে বাজার থেকে হাতে বড় রুইমাছ ঝুলিয়ে। কি মেসোমশাই, কত দিয়ে কিনলেন? এত তাজা মাছ!দাদুভাই বাজার নিয়ে ফেরা মাত্র আমরা বাড়ির সব সদস্য রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে। মাছের প্রশংসা করতে হবে। দাদুভাই দেখাচ্ছে। কানকো তুলে কী লাল। বুক্ টা মাছের প্রায় গোলাপি। দাদুভাই আজ নেই। রবিবারের বাজার থেকে আসা মাছ প্রশংসা করবার স্মৃতিটুকু থেকে গেছে। সেই সাথে জন্মদিনের স্বাস্থ্যকর রসগোল্লা।
মা সবসময় আমাদের জন্মদিনে বন্ধু বান্ধব আর তাদের বাবা মা মিলিয়ে নিমন্ত্রণ করে ফেলত প্রায় তিরিশ চল্লিশজন। আমরাও বন্ধুদের জন্মদিনে যেতাম গরমকালে নাকে পাউডার আর শীতকালে পন্ডস্‌ স্নো মেখে । গুডিব্যাগের চল ছিল না। নিজেদের জন্মদিনে উপহার হিসাবে পেতাম ব্রাউন কাগজ বা খবরের কাগজে মুড়ে বই। শকট থেকে রকেটবুদ্ধিমতী মাশাদিয়েছিলাম শ্যামাকে। বই-এর উপযুক্ত মানুষ-কেই। ভিতরে লিখেছিলাম
'শুভ জন্মদিনে
শুভ কামনায়
দিদিভাই
একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৮'
একটু ফ্যান্সি পাতলা গোলাপি মত কাগজে মোড়া আর একটা উপহার। এই রকম সবুজ, হলুদ, গোলাপি, লাল কাগজ দিয়ে স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় শিকল বানানো হত। এ কাগজে মুড়ে বেশি উপহার আসত না। মাঝে মাঝে শুধু। বই-এর নাম মোরগ ভাইটি।ভিতরে গোটা গোটা মুক্তার অক্ষরে লেখা আছে
ছোট্ট মণিটির জন্মদিনে
জীবনের সার্থকতা কামনা করে-
দিপান ভাইয়া
মাঝে মাঝে পেন্সিল বক্স-ও পেতাম। নরম নরম স্পঞ্জমত তার ঢাকনি। গোলাপি, সাদা, নীল রঙে ছবি আঁকা।
জন্মদিনে নতুন জামা হ'ত। তবে শুধু নিজেদের বাসা থেকে জামা পেয়েই সন্তুষ্ট থাকত না বুদ্ধিমতী মাশা আমার ছোটবোন শ্যামা। দু, তিন বছর বয়স ওর। আমাদের ফ্ল্যাটের উপরতলায় থাকত রীণা আপা, বেবী আপা, মিতু। ছোটমেয়েদের মনে হয় অল্প লোভ থাকে। বাবার লোভ।নিজের বাবা নেই বলেই কিনা জানি না শ্যামা বেবীআপাদের বাবাকে আব্বা ডাকত। জন্মদিনের আগে চুপিচুপি গিয়ে ও তার আব্বাকে বলে এল, ‘আমাকে আর দিদিভাই-কে জন্মদিনে জামা দিবেন।মেরুন রঙ্গের সুইস ভয়েলের কাপড় এল। দিদা জামা বানিয়ে দিল। আমাদের সব জামা ঘরে বানানো হত। দিদা বা মনিমার শিল্পকর্ম সেসব। কী তুলতুলে যে ছিল ওই জামা। বদভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল শ্যামার লোভ। কাঁকনের মা শাহানারা মাসীকে বলে আর এক জন্মদিনে আমার আর নিজের জন্য গোলাপি আর শাদা রঙের ববি প্রিন্টের জামা জোগাড় করল সে। পূজায় দুটা, ঈদে একটা, দুই বোনের জন্মদিনে দুটা এই ছিল বছরে আমাদের নতুন জামা। স্কুল ড্রেস ছিল দুই সেট। আর বিকালে নীচে খেলতে যাওয়ার জন্য তিন চারটা জামা। বেড়াতে যাওয়ার জন্য, জন্মদিনে, নিমন্ত্রণে যাওয়ার জন্য তোলা থাকত আর দুতিনটা জামা। এছাড়া থাকত ঘরে পড়বার জামা। রাস্তায় বের হলে পাতাকুড়ানী ছেলে মেয়েদের খালি গা আর খালি পা দেখে নিজেদের খুব বড়লোক মনে হত। অথচ এই আমেরিকায় টিন এজ মেয়েদের ক্লজেট খুললেই দেখি হুঁড়মুড় করে জামা মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে। রাখবার জায়গা নেই। একবারও না পড়েই জামা দিয়ে দিচ্ছে গুড উইলে। কিনবার পরেই আর পছন্দ হয়নি তা।
জন্মদিন পৃথিবীর সেরা দিন। এর মত আর দিন হয় না।
তবে অতিরিক্ত আদরেও একসময় অরুচি ধরে। মনে আছে আঠারো বছরের জন্মদিনে মা যে নতুন জামা পরতে দিয়েছিল তা একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিলাম আমি। টীন এজ হয়ে গেছে। বাবা, মার ভালোবাসাটা লোকজনের সামনে তুচ্ছ করতে শিখে গেছি।
ছেলেবেলার এইসব জন্মদিন ফেলে এসে তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। আজকাল কেউ আমার জন্মদিন নিয়ে হুল্লোড় করলে বড় ভালো লাগে। মনে হয় এ আমার দিন। কেবল আমার।


তাই লাল আর হৈ তাথৈ-এর মুখে জন্মদিনের উপহারের কথা শুনে চোখ জুলজুল করে উঠল আমার।
লাল করাত শানাবে, তাথৈ ছবি আঁকবে, হৈ রঙ করবে। মনের মত সব। শিল্পীদের প্রতিভায় বাঁধা দেব, এমন অমানুষ তো আমি নই।
লিটল লাইব্রেরী আসলে একটু বড় সাইজের বার্ড হাউজের মত দেখতে। দুই ফুট বাই এক ফুট ছোট একটা ঘর বাড়ির সামনে মাটিতে মেইলবক্সের পোলের হাইটে লাগানো থাকে।


ভারি সুন্দর নকশা করা। জানালা আঁকা, দরজা আঁকা। চিমনি আছে। লাল, হলুদ বা নীল রঙের ওই ঘর। সাদা ভেনিসন ব্লাইণ্ড ঝুলছে। ফ্লাওয়ারবক্স জানালায়। তাতে ছোট ছোট ফুল ফুটে আছে। ডলস্‌ হাউজের মত মনে হয় আমার এই লিটল লাইব্রেরীকে। জলজ্যান্ত স্বপ্ন একেবারে। এই ছোট ঘরগুলোর ভিতর বাড়িতে যে বই এক্সট্রা হয়ে গেছে তা রেখে দেয় মানুষ। পথে চলতে ইয়ার্ডের পাশে রাখা এই বই নিয়ে যায় পাড়া পড়শী, পথিক। একটু দাঁড়িয়ে থেকে হয়ত গল্প করে। কখনো শুধু অল্প হাসি। কখনো কিছুই না। শুধু মনের ভিতর ভালো লাগা। আমেরিকার জীবনে সব জিনিষ এত অল্প সময়েই এত বেশি জমে যায়। বই-ও। স্মৃতি আঁকড়ে ধরে থাকবার বাইরেও প্রচুর জিনিষ।
অথচ দেশে দেখেছি মা যত্ন করে রেখে দিয়েছে আমাদের ক্লাশ টু-এর বই। কিছুতেই কাউকে হাতে ধরে দিতে পারে না। রমা শ্যামা লিখতে শিখেছিল সবুজ সাথী থেকে। রমা শ্যামা যে আজ তারপরে ’-ও শিখে ফেলেছে, তা ভাবতে ইচ্ছা করে না। চোখ জলে ভরে যায়। প্রত্যেক ভাদ্রমাসে মা সব বই বারান্দায় রোদ দেয়। ঝেড়েঝুড়ে আবার আলমারিতে তুলে রাখে। তবু পোকা কেটে ছোট ছোট ফুটো করে ফেলে বাবুদের তালপুকুরে। তবুও বাড়ির বই কাউকে দিয়ে দেওয়া যেন এক অমার্জনীয় অপরাধ।
এখানের হাফ প্রাইস বই-এর দোকান আর লিটল লাইব্রেরী দেখে তাই আমার ভারি অবাক লাগে। খুব লোভ সেই কবে থেকে এই লিটল লাইব্রেরীর উপর। আহা আমার ইয়ার্ডে যদি একটা বসানো যেত। খোঁজ নিয়ে দেখলাম দেড়শ ডলার মত দাম। কিন্তু লাল আর তাথৈ হা হা করে উঠল। ওরা নাকি বানিয়ে দেবে। এই লিটল লাইব্রেরীই হবে আমার জন্মদিনের উপহার। ওদের সকলের উত্‌সাহ দেখে আমার চোখ জলে ভরে গেল।
বরফ মাটি কামড়ে ধরবার আগেই নাকি তৈরী হয়ে যাবে আমার লাইব্রেরী। আমি স্বপ্ন দেখতে থাকলাম। পড়শিরা কুকুর নিয়ে হাঁটতে গিয়ে আমার বাড়ির পাশে একটু থামছে। আমার লিটল লাইব্রেরী খুলে বই নেড়েচেড়ে দেখছে। সব বই ফ্রী। পছন্দ হলে বই নিচ্ছে। আর আমি বাড়ির সব ঘরে দৌঁড়ে দৌঁড়ে সকলকে জানাচ্ছি, ‘নিয়েছে, নিয়েছে।স্বপ্নের ঘোড়ায় রশি টেনে ধরবার কোন ব্যাপারই নেই। আসলে নিঃসঙ্গতা আমেরিকার জীবনের বড় সঙ্গী। যে কোন অজুহাতে কোন মানুষকে একটু কাছে টেনে আনতে পারলে বুকের ভিতরটা যেন পালতোলা নৌকার মত দুলে দুলে ওঠে। সমস্ত অস্ত্বিত্ব ঘিরে বয়ে যায় সুবাতাস। আমেরিকায় মানুষকে কাছে টেনে আনা অত সহজ তো নয়। মানুষের কাজ আছে। ফ্রী তে বই দিয়েও তাকে পাওয়া যায় না।
এ বছর আমার পঞ্চাশ বছর হবে। বিরাট মাইলস্টোন। এত বছর ধরে কিভাবে পৃথিবী কাঁপিয়ে রাজত্ব করে গেলাম ভাবছি। ডাইনোসর-রাও মনে হয় এত বছর বাঁচে নি। তবে গত বছর কাঠের তক্তা পেয়েছিলাম। সে তক্তা এখনো লিটল লাইব্রেরীতে নিজের মেটামরফোসিস না ঘটিয়ে গ্যারাজের দেওয়ালে গা এলিয়ে কাত হয়ে পড়ে আছে। আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই। দেখা যাক, এ বছর কি পাই।


(৫)

শুভ কোথায়? শুভ কোথায়?” ডেকে ডেকে সারা। কিন্তু শুভর পাত্তা নেই। কুংকিমার (আমার মেজমাসি কুমকুম এর ) দুই ছেলে জয় শুভ। বিচ্ছু বললে কম বলা হয়। ছেলেবেলায় শুভ ঢাকায় ঝিকাতলার দোতালা বাসার উঁচু তাকে বসে থাকত। তারপর আয়নাতে দেখে বাড়ির সামনে যে লোক যেত তার গায়ে ঢিল মারতো। ওদের যন্ত্রনায় আমার মাসি মেসোর জনসমাজে মুখ দেখানো কঠিন ছিল।

তাই যখন ওদের পর আমার মাসতুত বোন মৌটুসীর জন্ম হ'ল দাদুভাই সারা ক্যাম্পাসের চেনা শোনা সব বাড়িতে রসগোল্লা পাঠিয়ে দিল। ঘর আলো করে সোনা রঙের নাতনি এসেছে। মৌটুসীকে সোনালী রঙের একটা ডলপুতুল বলেই মনে হত। মাথা ভর্তি ঝাঁকরা কোঁকড়ানো চুল। দাদুভাই এর বক্তব্য এবার মেয়েটার হয়তো একটু শান্তি হবে। দুই জলদস্যু নাতির পর শান্তমত এক রাজকন্যা নাতনি।

এদিকে শুভর তো পাত্তা নেই। কুংকিমারা ফেরত যাবে। বাসের সময় হয়ে গেছে। শুভ নেই। শুভ নেই। আসলে কুংকিমারা ঢাকা থেকে গরমের ছুটিতে রাজশাহী আমাদের বাড়ি এসেছে। এমনি সবসময়। হয় আমরা ঢাকা যাই নয় ওরা রাজশাহী আসে। পূজার ছুটি, ঈদের ছুটি, গরমের ছুটি বা শীতের ছুটি কোনোটাতেই কোনদিন কুলু, মানালি যাওয়া হয়নি আমাদের । বরফে ঢাকা পাহাড়চূড়া , ঝাঁপিয়ে পড়া ঝর্ণা কিংবা পাহাড়ের মাঝের সবুজ উপত্যকা দেখা হয় নি। শুধু মানুষের হৃদয় দেখেছি , মানুষের সাথেই সময় কাটিয়েছি। অপরূপ সব সময়। অবশেষে শুভকে পাওয়া গেল। বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। ও বাড়ি ফিরে যাবে না।

দিদার কাছে শুনেছি আমি নাকি ছেলেবেলায় সবাইকে বলে বেড়াতাম আমরা দুই ভাই দুই বোন। কিন্তু ভাই দুটো খুব দুষ্টু। মা সামলাতে পারে না বলে আমার মাসির কাছে ভাই দুটোকে দিয়েছে। জানি না নিজের ভাই এর থেকেও আপন হয় কিনা।

(৬)
ঠুক ঠুক ঠুক। দরজায় কড়া নাড়বার শব্দ। কি ব্যাপার? কে? ভদ্রস্যার দাঁড়িয়ে আছেন। দিদার গ্রামের বাড়ি সরিষাবাড়ী। এখন আর খুব কেউ নেই সরিষাবাড়ীতে দিদার। নদীতে যেমন ভাঙ্গন হয়, ঠিক তেমন ভাঙ্গন ধরে একটি দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রেও । দিদার পরিবারের প্রায় সবাই ইন্ডিয়াতে। হিন্দু বলে বাংলাদেশে থেকে যাবার সাহস হয় নি ওদের।

ভদ্রস্যার সরিষাবাড়ী র মানুষ। এ যে নাড়ির টান। নিজের গ্রাম থেকে দূরে দিদাই তাঁর পরম আত্মীয়। ঠিক হয়ে গেল যতদিন ভদ্র স্যারের পরিবার রাজশাহী না আসছেন, উনি আমাদের বাড়িতেই থাকবেন। অসম্ভব মেধাবী শিক্ষক ভদ্রস্যার। অংক, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, বাংলা, ইংরেজি সব বিষয় সমান দক্ষতায় শিখিয়ে দিতে পারেন। আমাদের তো পোয়াবারো। ঘরের ভিতরই স্কুলঘর। যত প্রশ্ন তার সাথে সাথে উত্তর। এক পা হেঁটে অন্য কোথাও যেতে হচ্ছে না।

সেই সাথে একটু ইমপ্রুভড ডায়েট ও পাওয়া গেল। বাড়িতে কেউ থাকলে একেবারে এলেবেলে খাবার তো আর দেওয়া যায় না। সম্মান বলে একটা শব্দ আছে তো। আসলে আমাদের বাড়িতে অনেক মানুষ। প্রতিদিন দুপুরে আট থেকে দশ জন খেতে বসি। দাদুভাই দিদা প্রানপন চেষ্টা করে আমাদের সকলের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা করতে। চিরতা, আমলকি, হরিতকির জলের অভাব নেই। কিন্তু বহু বহু বছর পর একদিন শুনি কুংকিমা বলছে ডিমের ঝোলে আসলে আস্ত ডিম দেয়। প্রত্যেকে আস্ত ডিম খায়। ছেলেবেলায় জানতাম দেশি মুরগির ডিম অর্ধেক করে রান্না করলে মসলা ঢোকে ভিতরে, স্বাদ ভালো হয়।

(৭)

বসবার ঘরে মাটিতে বিছানা হয়েছে। মাটিতে গড়াগড়ি দিতে দিতে কাছাকাছি জড়ো হয়ে আসছি আমরা সবাই। ভুতের গল্প শুরু হবে। জোরে জোরে নি:শ্বাস পড়ছে আমাদের । হাত পা টানটান। কানের ভিতরটা কেমন গরম হয়ে আসছে। এমনই সবসময়। অনিল মেসো এসেছে ঢাকা থেকে। কুংকিমা , জয় , শুভ, মৌটুসী তো আগে থেকেই ছিল। গরমের ছুটি। বড় ঘরটায় যে দাদুভাই দিদার বিয়ের বার্মা টিকের খাটটা আছে তা কুংকিমা, মেসোকে দেওয়া হয়েছে । আমরা কুচো কাচার দল সব ঢালাও বিছানায়। বাড়িতে যত মানুষ তত ঘর নেই, বিছানাও নেই। তাতে কি? মাটি তো আছে।

পরে বড় হয়ে আমি এই মাটির বিছানা নিয়ে অনেক ভেবেছি। যে বাড়িতে যত এই মাটিতে বিছানা হয়েছে সেই মানুষগুলো যেন তত বেশি উদার। নিজেরটুকু অন্যের সাথে ভাগ করে নিতে শিখেছে তারা। স্বার্র্থপরতা এক রোগ। কোন চিকি
সা নেই তার।

এ বছর বেশ গরম পড়েছে। রাজশাহীর গরম বলে কথা। মাটির বিছানায় শীতল পাটি বিছানো হয়েছে। তাও জ্বলে যাচ্ছে গা। গরমের জন্য কাঠের জানালার যেটুকু কাচের, সেটুকু সবুজ রঙ দিয়ে লেপা। বালতি বালতি জল রাখা সব ঘরে। বাষ্প হয়ে একটু যদি ঠান্ডা করে ঘর। দিনে কমপক্ষে দু'বার ক'রে ঘর মোছা হচ্ছে। সারাদিন বের হওয়া যায় না। সন্ধ্যার দিকে একটু ঠান্ডা হয়। বেলিফুল , গন্ধরাজ ফুটতে শুরু করে। গন্ধরাজকে ভালবাসবার জন্যই যেন গরমকালে বেঁচে থাকা।

গরমকালের দুপুরে কালো পোশাক পড়ে চোঙ্গা হাঁকিয়ে হজমিওয়ালা আসে। 'হজমিদানা , তেলাপোকা মারা ছারপোকা মারা হজমিদানা, পেটের মামলা ডিসমিস করে, হজমিদানা ...' আমাদের ভাইবোনদের পেটে কোন মামলা নেই, কিন্তু কালো আচারের মত হজমিদানা চেটে চেটে খাওয়ার খুব লোভ। কিন্তু বাড়ির স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জন্য বাইরের কিছুই খাওয়া হয়না আমাদের। খেতে পারি না সবুজ রঙের বেলি আইসক্রিম পর্যন্ত । নিঝুম দুপুরের ঘুঘুর ডাক ছাপিয়ে টুং টাং ঘন্টা বাজিয়ে আইসক্রিম ওয়ালা হেটে চলে যায়। জয় শুভ স্বান্তনা দেয়। 'মন খারাপ কোরনা দিদিভাই, রাঙাদি। ঢাকা গেলে তোমাদের নিয়ে গিয়ে ইগলু আইসক্রিম খাবো , সে তো আর রাস্তার না। কেউ ছড়ি ঘোরাতে পারবে না। ' বিজ্ঞদের কথায় মন ভালো হয়ে যায়।

বিকাল হলেই কচলে কচলে আম আর কাঁঠালের রস করে দিদা। তালপাতার পাখা দিয়ে অন্য হাতে মাছি তাড়ায়। দুধ ভাতের সাথে মিশিয়ে দেয়। এটাই বিকালের খাবার। আমি দুধের সর পাওয়া নিয়ে মারামারি করি সব ভাইবোনদের সাথে। ওরা নির্ধিদ্ধায় বলে ওঠে, 'সরটা তুমি ই নাও, দিদিভাই। ' আজ ভিগান হয়ে খাসির কষানো মাংসের লোভ আমার চলে গেছে, কিন্তু দুধের সরের লোভ টা আজো ছাড়তে পারি নি।

আকাশ কালো করে আসে। বাইরে কালবৌশাখী ঝড়। আর ভিতরে আমরা ততক্ষনে তারস্বরে গান ধরেছি
'ঝড় এল এল ঝড়
আম পড় আম পড়
কাঁচা আম ডাসা আম
টক টক মিষ্টি
এই যা এল বুঝি বৃষ্টিই...'
কে একটা কাসুন্দি আর কাঁচা মরিচ দিয়ে কাঁচা আম মেখে নিয়ে আসে । চেটে চেটে হাতের চামড়া তুলে ফেলি আমরা।

(৮)

শিউলি ফুল সাদা হয়ে পরে আছে জাকির ভাইদের দেয়ালের বাইরে। কমলা রঙের বোঁটা। হাঁসের ঠোঁটের মত রঙ। আমি আর প্রিয় বন্ধু কেয়া যত তাড়াতাড়ি পারি ফুল কুড়াচ্ছি। ফুল কুড়ানো শেষ হলেই সাইকেল চালানো প্র্যাকটিস করতে যাব। এ বছর স্কুলের প্রতিযোগিতায় মেয়েদের ও সাইকেল চালানো দিয়েছে। দিলে কি হবে? দেখা গেল আমি চারজনের মধ্যে ফোর্থ হলাম আর শিলু অন্য সব খেলার মত ফার্স্ট। পৃথিবীতে কিছু জিনিস আছে যা চেষ্টা করেও হয় না। অনেক মনোযোগ দিয়েও না। দমবার পাত্র আমি নই। সাইকেল চালানো প্র্যাকটিস করবার পর পরই যাব সাঁতার শিখতে।

গোপাল মামা কেয়া, পিয়া, শ্যামা আর আমাকে শেখাবে। গোপাল মামা মার কাকাতো ভাই। আমাদের বাসায় থেকে রাজশাহী কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ে। একদিন দাদুভাইকে বলতে শুনেছিলাম। 'আমি হলাম আমাদের বাড়ির প্রথম জেনারেশন যে গ্রাম থেকে শহরে এসেছি। আমার উচিত অন্যদের টেনে আনা। ' দাদুভাই জীবনভর টানাটানি অনেক করেছে। উপরি পাওনা হিসাবে আমরা সাঁতার শিখেছি।

কিন্তু সাঁতার শেখা কি মুখের কথা? গোপালমামা আমাদের পেটে র কাছে ধরে থাকে। আমরা উল্টো হয়ে ভাসবার চেষ্টা করি।

স্কুলের সামনের বড় পুকুরটায় শিখি। বাঁধানো ঘাট। ভেজা ভেজা শেওলার গন্ধ নাকে এসে লাগে। গভীর জলের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয় জলের নিচে বুঝি পাতালপুরী আছে। হয়ত কোন রাজকন্যাও । কোনদিন যে মাটির উপর আসতে পারেনি। কিছু কিছু মানুষ রাজকন্যা হয়েও জীবনভর বন্দি হয়ে থাকে। আমাদের টিনের চাল দেওয়া স্কুল ঘরটার পাশে জারুল গাছের সারি। তা থেকে বেগুনি রঙের ফুল মাটিতে ঝরে পড়ে।

(৯)

প্রিয় বন্ধুর কথায় পরম বন্ধুদের কথা বলতে ইচ্ছে করে। অনুপ, রঞ্জন, দীনু, সন্তু, হিতু, সুদীপ, পথিক, নিলয়, শৈবাল, মানস,করবী। অসুস্থ শরীর নিয়ে বহুবার বি সি রয় হসপিটালে ভর্তি আমি। বিকাল হলেই ওরা হাজির। সাথে আমার বিড়ালছানা সাশা। সাশার একটা চোখ নীল একটা চোখ খয়েরি। এমন দেখি নি। মাঝে মাঝেই রাতে আমার বিছানায় শুয়ে রাত কাটাত ও। আর আমি চেয়ারে বসে। খড়গপুরের ঠান্ডায়।

বালিয়াপালে মিসাইল লঞ্চের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে।খড়গপুর থেকে চললাম সাইকেল চালিয়ে। অতটা পথ। কিভাবে সম্ভব ছিল? আমি তো কোন বীর নই। কিছু পর পর আর যেতে পারি না। ওরা আমার সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে প্রায় টেনে নিয়ে চলে। গ্রামে গ্রামে থেমে পথনাটক করে। গ্রামের পুকুরে নেমে স্নান করি। ছাপড়ায় লাউ-এর ঘন্ট দিয়ে ভাত জোটে। রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে মাটিতে ঘুমিয়ে থাকি। আমি কিছু বুঝে আর কিছু না বুঝে শুধু প্রাণের টানে ওদের সাথে সাথে চলি। দল বেঁধে দলছুট হওয়ার গল্প বলত ওরা। হোস্টেলে বিপ্লবের লাল ছবি ওদের দেয়ালে আঁকা।
'আমি শুনেছি সেদিন
তুমি তুমি তুমি তুমি মিলে
তোমরা সদলবলে সভা করেছিলে
আর সেদিন তোমরা নাকি অনেক জটিল ধাঁধা
না-বলা অনেক কথা কথা তুলেছিলে.....
আমি শুনেছি তোমরা নাকি
এখনও স্বপ্ন দেখ, এখনও গল্প লেখ
গান গাও প্রাণভরে
মানুষের বাঁচামরা এখনও ভাবিয়ে তোলে
তোমাদের ভালবাসা এখনও গোলাপে ফোটে'

একদিন বিকালে ওরা একটা গোলাপি রঙের সূতির শাড়ি নিয়ে হাজির। জড়ি পাড়। আমি খড়গপুর থেকে পাশ করেই বিয়ে করবার জন্য প্রস্তুত। ওই শাড়ি পড়েই নাকি বিয়ে হবে। সেবার স্বপ্নটা ছোঁয়া হয় নি। শাড়িটা এখনো আমার কাছে আছে। ছাব্বিশ বছর হয়ে গেছে। গোলাপি রঙের সূতির শাড়ি। জড়ি পা--ড়। মাঝে মাঝে চোখের জল চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে না। বুকের ভিতর থেকে একটা শক্তমত কিছু গলার কাছে এসে আটকে যায়। আমার পরম বন্ধু।

(১০)

তখন আমরা রংপুরে থাকি। সকালবেলা বেশ কয়েকটা বই বগলদাবা করে বাড়ির সামনের বেলতলাতে যাই। পনেরো বিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকি। তারপর ঘরে আসি। বিকালেও একই অবস্থা। পরিতোষমামা জিজ্ঞাসা করে, 'কি করছ রমা?' হাতেনাতে ধরা পড়ে উত্তর দেই,'স্কুলে যাচ্ছি আর স্কুল থেকে ফিরছি।' পরিতোষমামাও মার কাকাতো ভাই। গোপালমামার বড়। আমাদের বাড়ির আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কারমাইকেল কলেজে পড়ে। মণিমাও(আমার ছোটমাসী) কলেজ যায়। আশেপাশের বাড়ির বাচ্চারাও দিন শুরু হলেই স্কুলে চলে যায়। আমারই শুধু চার বছর, আমারই শুধু স্কুল নেই। তাই বাড়ির সামনের বেল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ভাবি আসা যাওয়ার পথে লোক তো অন্তত দেখবে আমি বই হাতে চলেছি; তার মানে আমিও স্কুলের সম্মানিত, মাননীয় একজন।

পরিতোষ মামার গুণের শেষ নেই। পুকুরে জলের উপর পদ্মাসন করে ভাসতে পারে। খপ করে খালি হাতে পুকুরের জলের ভিতর থেকে মাছ ধরতে পারে। আমি ভাবি পরিমামা নির্ঘাত চাইনিজ সার্কাসের মেম্বার।

পরে পরিমামার মাঝরাতে দৌড়ে ছুটে আসবার মহ
গুণও প্রকাশ পেল। বড় ডাক্তার হ'ল পরিতোষমামা।

রাত দুটায় দিদার শরীর ধড়ফড় করছে কিংবা দাদুভাই, মণিমা, মা, মেসো বা কুংকীমার জ্বর, হয়ত নি:শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সাথে সাথে পরিতোষমামা মাথার কাছে। রংপুরের গুপ্তপাড়ার বাড়িতে থেকে পরিতোষমামা যখন কারমাইকেল কলেজে পড়ত, দাদুভাই কাঠের খড়ম পড়ে লাল মেঝের উপর দিয়ে হেঁটে যেত। খড়মের শব্দ শুনতে পেতাম। কিন্তু জানতে পারিনি মনে মনে দাদুভাই ভাবত কিনা যে এই ভাইএর ছেলেটিই একদিন পরিবারের সকলের প্রাণ বাঁচাবে। রাত শেষ হয়ে হয়ত ততক্ষণে কাছের মসজিদ থেকে আজানের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিপদ কেটে গেছে। ভোর হচ্ছে।

(১১)

গলায় বেলিফুলের মালার এক একটি ফুলের মত আর একটি ফুল মা-দের রেখাপিসি। আমরা তো দিদা বলিনা অল্প বয়স বলে। ডাকি রেখাদি। দাদুভাই-এর মামাতো বোন। নিকলীর গ্রাম থেকে এসেছেন আমাদের সাথে থেকে রাজশাহী গভ: কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়বেন বলে।

নিকলিকে বাংলাদেশের ভেনিস বললে কম বলা হয়। চারদিকে শুধু জল আর জল । হাওর এলাকা। বর্ষাকালে প্রায়ই এক বাড়ি থেকে আর এক বাড়িতে ডিঙি নৌকা করে যেতে হয়। সেবার যখন গিয়েছিলাম দেখি ড্রাম ড্রাম মাছ। এতো মাছ আমি জীবনে একসাথে দেখি নি। মোটা চালের ভাতের উপর উঁচু করে পুঁটিমাছ ভাজা। মাছের পেটের তেল দিয়ে ভাত মেখে খেতে হয়। ট্যাঙরা মাছ, বাটা মাছ, কেঁচকি মাছ, পাবদা মাছের ঝোল কিংবা সর্ষে বাটা দিয়ে রাঁধা । এত মাছ যে খেয়ে শেষ করা যায় না। করা হয় শুঁটকি। খেলাম পুঁটি মাছের চ্যাপা শুঁটকি। অসম্ভব ঝাল, টকটকে লাল রং, অনেক রসুন দেয়া, অসংখ্য কাঁচা মরিচ উঁকি দিচ্ছে। কোন সবজি নেই তাতে, শুধু মাছ। একেই বলে চাঁছনি। ভাবলেই জিভ থেকে জল পড়ে।

রেখাদি তো এলো, কিন্তু তার জামা কাপড় গ্রামের মেয়েদের মত। সালওয়ার বা চোস্ত পাজামা চলছে তখন শহরে। কিন্তু রেখাদির পরনে ঢোলা পাজামা - ছেলেদের মত। কামিজটা ছোট মত। মা-র তো মহা চিন্তা। না, এভাবে তো শহরের অন্য মেয়েদের সাথে মিশে থাকতে পারবে না পিসি। জামা, সালোয়ার বানানো হ'ল শহুরে ছাঁটে। আমার শেখ সাদির ব্যঙ্গ মনে পড়ল। মানুষের পোশাকেই
পরিচয়?

অসম্ভব অধ্যবসায়ী ছাত্রী রেখা দি। সন্ধি, সমাস দুলে দুলে পড়ে সে । ইংরেজি গ্রামারের নিয়ম মুখস্ত করে। ততদিনে আমার গায়ে হাওয়া লেগেছে। ইংরেজি নাটক পড়ছি। গ্রামার পড়বার মত ধৈর্য্য বা মন মানসিকতা কিছুই আমার নেই। তবে রেখাদির চারপাশে ঘুরতে ভুলিনা। রেখাদির জোরে জোরে পড়া শুনে আমারও জ্ঞান লাভ হয়। পরীক্ষা উ
রাতে অসুবিধা হয় না। রেখাদি জীবনে এখন অনেক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু নিজে নয় , নিজের অন্যান্য আত্মীয় স্বজন কেও হাত ধরে টেনে এনেছে। মা বলে ও তো একা নয়, ওর বর ও হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

ছেলেবেলায় সমাজ বিজ্ঞান বইতে পড়েছিলাম মা , বাবা , ভাই বোন নিয়ে হয় পরিবার। আর কিছু কিছু পরিবার থাকে যারা হল যৌথ পরিবার। সেখানে থাকে দাদা, দাদি, চাচা, চাচী, চাচাতো ভাই বোন। আমসত্ত্ব শুধু নিজের ভাইবোন নয়, চাচাতো, মামাতো, কাকাতো, ফুফাতো, মাসতুত ভাইবোনদের সাথেও ভাগ করে খেতে হয়। আর পুর্নিমার রাতে সবাই মিলে একসাথে একটা মাদুরে বসতে হয়। একটা একলা ফুল নয়, থোপা থোপা বেলিফুল ই দেখতে সবচেয়ে সুন্দর।

(১২)

গ্রামের মানুষকে শহরে এনে পড়াশোনা শেখানোর মহান প্রচেষ্টা সব সময় সফল হয় না। আমার বাবার বাড়ি সিলেটের হবিগঞ্জের চুনারুঘাট । মার খুব ইচ্ছা আমার জ্যাঠার ছেলে মেয়েদের জন্য কিছু করে। বাবার দিকে খুব আত্মীয় স্বজন নেই আমাদের। ঠাকুমা, ঠাকুরদা মারা গেছেন। আমার কোন পিসী নেই। বাবারা কেবল দুই ভাই। বাবা মারা যাওয়ার পর শুধু আছেন জ্যাঠামশায়।আর জ্যাঠামশায়ের ছেলেমেয়ে - কুসুমদিদি, কোকিলদিদি, কাঞ্চন , পুষ্প আর বংশের একমাত্র ছেলে নারায়ণ।বিয়ের পরপর ঢাকায় বুয়েটের কোয়ার্টারে কুসুমদিদিকে কাছে এনে রেখেছিল মা। এবার নিয়ে এল কাঞ্চনকে। আমরা তখন রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে থাকি। কাঞ্চন এল। সিলেটের ভাষা বাংলা বলেই মনে হয় না। হবিগঞ্জের ভাষা সে তুলনায় কিছুটা সুবিধার হলেও খুব কিছু বুঝি না আমরা। কাঞ্চন খুব প্রাণবন্ত মেয়ে। অনেক কথা বলে। আমরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি।

কাঞ্চনের চুল লালচে মত, সব আগা ফাটা। নাহ, এভাবে চলবে না। খুব ছোট করে প্রায় বয়কাটের মত করে কেটে দেওয়া হল চুল। কমলা, হলুদ ছোপ ছোপ স্কার্ট আর ভারি সুন্দর অফ হোয়াইট ক্রেপ কাপড়ের টপ পড়ল কাঞ্চন। শহরে এসে আমাদের সাথে মিশে যাওয়ার সব অত্যাচার মুখ বুজে মেনে নিল ও। কিন্তু আসল যে জন্য ওকে আনা সেই পড়াশোনায় লবডঙ্কা। অনেক বয়স হয়েছে, কিন্তু গ্রামে থেকে খুব কিছু শেখেনি ও। ক্লাশ ফোরে ভর্তি করবার চেষ্টা ক'রা হল বয়স তেমন বলে । কিন্তু ও পড়াশোনা জানে ওয়ানের মত। স্কুলে নিল না। তখন বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করতে থাকল ও। আমাদের সাথে বিকালে খেলতে যায় অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে। যতটুকু মিশে থাকা যায়। বাচ্চাদের মত নিষ্ঠুর প্রাণি খুব কম হয়। কাঞ্চনের চুল, ভাষা, পড়াশোনা, হেঁটে চলা, বয়স কোনকিছু থেকেই পাঁচগাতিয়া গ্রামকে মুছে ফেলা যায় নি।

অনেকদিন থাকল আমাদের কাছে কাঞ্চন। মা আর দাদুভাই এর কপালে অনেক ভাঁজ দেখলাম। তারপর একসময় কাঞ্চন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস ছেড়ে পাঁচগাতিয়া গ্রামে ফিরে গেল। ততদিনে ওর উপর আমাদের খুব মায়া পড়ে গেছে। কাঞ্চনও চোখ মুছে বলল, "ফরে এখবার মাতমু নে। ( পরে একবার কথা বলব) " কি জানি ওই বিরাট সুরমা নদীর মাছও এ্যাকোয়ারিয়ামে আটকা পরে কাচের দেয়াল ভালোবেসে ফেলেছিল কিনা।

(১৩)

কাঞ্চন গ্রামে চলে গেল। জ্যাঠামশায় সিলেট থেকে মাঝে মাঝে আসেন। তখনো যোগাযোগ অবস্থা অত ভালো না। সিলেট থেকে রাজশাহি অনেকটা পথ। বাংলাদেশের এ প্রান্ত আর ও প্রান্ত। জেঠু হয়ত খাওয়ার টেবিলটায় বসে সবার সাথে গল্প করছেন। আমি ভয়ে ভয়ে আশেপাশে ঘোরাফেরা করছি। মণিমার এক ধমক। যা কাছে যা। এটাই তোর রুট। নিজের রুট টা চিনে নে।

জেঠু সাথে করে নিয়ে আসতেন আমাদের গ্রামের জমির চাল। জেঠু মারা যাবার পর নারায়ণ সব সময় চাল নিয়ে এসেছে। বিন্নির চাল, আতপ চাল। পাঁচগাতিয়াতে বিন্নীর ভাত সাধারনত: সকালে খেয়ে কাজে যায়। পেটভরা থাকে। আর ফেনা ভাতও করে। ফেনা ভাত আতপ চাল দিয়ে হয়। একটু জল বেশী দেয়। ফেন গালেনা। বিন্নির ভাতও স্টিকি হয়। মাড় গালেনা।বিন্নির ভাত কেউ সিদ্ধ দিয়ে খায়। কেউ মাছভাজা দিয়ে খায়। যে যেমন যোগাড় করতে পারে।

নারায়ণ যে চাল দেয় তা থেকে অল্প হলেও মা প্রতিবার আমার হৈ, তাথৈ আর শ্যামার রিভু, তিথির জন্য নিয়ে আসে আমেরিকায়। একদিন সকালে ফেনা ভাত করে। বিন্নি চালের ভাত করে। দুধ সিরিয়াল না খেয়ে সেদিন ওরা তা আলু সিদ্ধ, ঘি দিয়ে মেখে খায়। আমার এত অদ্ভুত লাগে। সেই কোন পাঁচগাতিয়া গ্রামের থেকে বয়ে আনা চাল খাচ্ছে আমার ছেলে মেয়েরা এই সুদূর ম্যাডিসনে বসে। বিন্নির ছোট ছোট চাল ছোট ছোট কথার মত মাথার ভিতর গল্প গাঁথতে থাকে।

আমি খড়্গপুর আই আই টি তে পড়তে যাবার আগে মা শ্যামাকে আর আমাকে নিয়ে পাঁচগাতিয়া গ্রামে গেল। সকলের আশির্বাদ নিয়ে আসবার জন্য। সিলেটের মানুষের কাছে লন্ডন নামটা খুব পরিচিত। বহু মানুষ সিলেট থেকে লন্ডন গেছে ছোটখাট নানা কাজ নিয়ে জীবিকা অর্জনের জন্য। বছরের পর বছর। শুনেছি লন্ডনে সিলেটী পাড়া পর্যন্ত আছে। আমাকে অনেকে বলল, "ইন্ডিয়া কেন যাবা? লন্ডন যাও।"

গ্রাম ভেঙে মানুষ এসেছে শ্যামাকে, আমাকে আর মাকে দেখতে। আশেপাশের গ্রামও বাদ নেই। ওরা একবার শুধু চোখ ভরে দেখবে ক্ষিতীশের মেয়েদের। আর মা তো ওদের কাছে দেবীর মত। সাতাশ বছর বয়সে বিধবা হয়ে কিভাবে মানুষ করল মেয়ে দুটো। কিভাবে সম্ভব? আর ক্ষিতীশ? সে তো শুধু গ্রাম নয় চেনাশোনা সব মানুষের কাছে কিংবদন্তী। আমরা যখন পাঁচগাতিয়া গ্রামে গেলাম, শেষ ক'মাইল হেঁটে যেতে হল। রিক্সা পর্যন্ত চলে না। গ্রামে পড়াশোনার কোন খবর নেই। সেই নাম না জানা গ্রাম থেকে উঠে এসেছে বাবা। মুক্তার মত হাতের লেখা। অসম্ভব মেধাবী। নিজের চেষ্টায় বুয়েটে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে সেখানেই শিক্ষকতা। কলম্বো প্ল্যান স্কলারশীপ নিয়ে পি এইচ ডি করতে ইংল্যান্ড যাওয়া।দেশে ফিরে ঢাকায় সায়েন্স ল্যাবরেটরীতে যোগ দেওয়া। পরে ১৯৭১ এ বম্বে আই আই টি তে রিসার্চ এর কাজ। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। পড়িমড়ি দেশে ফিরে আসা। সাথে সাথে মৃত্যু। এক অসম্ভব প্রতিভাবান, প্রাণবন্ত জীবন শেষ হয়ে গেল ।

গ্রামের মানুষ আজো বিশ্বাস করতে পারে না। তাদের ক্ষিতীশ? কিংবদন্তীর ক্ষিতীশ? ওরা কেউ যা পারেনি, ক্ষিতীশ তা পেরেছিল। ক্ষিতীশের মেয়ে দুটোর হাত, মাথা ছুঁয়ে দেখে ওরা। জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। ঘরের ভিতর দেখে। এক মুহুর্ত চোখের আড়াল হতে দেবে না। গ্রামের মানুষের এত সারল্য সহ্য করবার মত মনের গঠন আমাদের ছিল না। এত ভালোবাসা আমাদের হাতের মুঠো থেকে উপচে পড়ল। উত্তেজনায় শ্যামার একশ দুই জ্বর এসে গেল। আমরা বেশিদিন থাকতে পারলাম না। মনে আছে আসবার আগের দিন পূর্নিমা ছিল। জ্যোতস্নায় আমাদের মাটির ঘরের ভিটেটা ভেসে যাচ্ছিল।

বিয়ের পর আমি কোলকাতায় কাটিয়েছি সাত বছর। লেকটাউনের বিরাট বাড়ি। বাড়িতে লাল ছাড়া কেউ নেই। বাংলাদেশে ফেলে আসা ঘর ভর্তি মানুষদের কথা মনে হয়। পাগল পাগল বেশি লাগলে বাসে চেপে যাদবপুরে মীরাদিদার বাড়ি চলে যাই। মীরাদিদা আমার দিদার সবচেয়ে ছোটবোন। নানা কিছু রান্না করে খাওয়ায় আমাকে। লইট্যা মাছ, লাউ চিংড়ি, নারকোলের পুর ভরা পটল।

যে সব মেয়েরা অনেক মানুষের মধ্যে বড় হয়েছে বিয়ের পর তারা একা থাকতে পারে না। ওদের দমবন্ধ হয়ে আসে। লেকটাউনের ছাদে গিয়ে দাঁড়াই। ছাদ থেকে গায়ে গায়ে লাগা পাশের বাড়ি দেখা যায়। বাড়ির বড় ছেলেটা আবার মদ খেয়ে ফিরেছে। নতুন বিয়ে করেছে। প্রতিদিনই এমন। আকাশ কালো করে এসেছে। ঝড় হবে। বাড়ির পাশের নারকেল গাছগুলো এলোপাথাড়ি মাথা ঝাঁকাতে থাকে। সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসি। লেকটাউনের বাড়িতে দাদুভাই, দিদা কিছুদিনের জন্য থাকতে এসেছে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান দাদুভাই এর খুব প্রিয়। আমার মুখে হাসি না দেখলেই দাদুভাই বলত
"হবিগঞ্জের জালালী কইতর
সুনামগঞ্জের কুড়া,
সুরমা নদীর গাংচিল আমি
শূইন্যে শূইন্যে দিলাম উড়া,
শূইন্যে দিলাম উড়া রে ভাই
যাইতে চান্দের চর,
ডানা ভাইঙ্গা পড়লাম আমি
কইলকাত্তার উপর
তোমরা আমায় চিননি
তোমরা আমায় চিননি..."

মানুষ ভাসমান কচুরিপানা নয়। তার শিকড় মাটির অনেক নীচ থেকে জল টেনে আনে। মানুষের বুকের ভিতর একটা মাটির গন্ধ থাকে। আমি সিলেটি ভাষা বলতে পারি না। বুঝতে পারি আমার ছেলেমেয়েরা যতটুকু বাংলা বোঝে তার থেকেও কম। তবু দাদুভাই এর ভাঙা ভাঙা গলায় এই গান শুনে আমার চোখ জলে ভরে যায়।

(১৪)

ভীষণ মনখারাপ থেকে মন সরাতে সাদা সাদা চন্দ্রমল্লিকা ফুলের কথা ভাবতে থাকি। আমার জীবনের ঘিরে থাকা অসংখ্য মানুষদের কথা ভাবতে থাকি। সুন্দরের কথা ভেবে মানুষ বুঝি মৃত্যু থেকে ও ফিরে আসতে পারে। সাদা সাদা চন্দ্রমল্লিকা। মাঝে হালকা ঘিয়ে রঙ। চন্দ্রমল্লিকার উপর কুঁচকুঁচে কালো ভোমরা বসে আছে।কিছু মানুষও এমন বিষাক্ত হয়। বিষাক্ত ভোমরা দেখে ভয় পাই না। বিষাক্ত মানুষ দেখে ভয় পাই।

রাজশাহীর এ মাথা থেকে ও মাথা বিশাল লম্বা বারান্দায় দাদুভাই-এর প্রায় একশো'র উপর টব। দুই সারি ক'রে রাখা। চন্দ্রমল্লিকার সাদা রঙ দেখে মনে হয় রাজশাহীর মত জায়গাতেও যেন বরফ পড়েছে। নরম তুলার মত পেঁজা পেঁজা । প্রতি শীতকালে বারান্দার বাগান দেখবার মত। কোন মালি দিয়ে নয়, নিজেই সব ক'রে দাদুভাই। এক বছর চন্দ্রমল্লিকা , পরের বছর বড় বড় সোনালি-হলুদ গাঁদা। কাজলার মোড়ে এসে কেউ আমাদের বাড়ির ঠিকানা চাইলে লোকজন বলে, 'চলে যান, যে বাড়ির বারান্দায় গাঁদা ফুল উপচে পড়ছে, সেটাই বাড়ি। ' ফুলের রানী গোলাপ করতে দেখিনি কোনদিন
কি জানি নানা পেস্টিসাইড স্প্রে করতে হয় বলেই কিনা। ফুলেল কোট পড়া সাহেবি জীবন থেকে চিরদিন দূরে দূরে থেকেছে দাদুভাই। আর হ'ত পিটুনিয়া। আমার ওদের কোনো জাতের ফুল বলে মনে হয় না যদিও। জংলী মত। তবে রাজশাহীর কাঠফাটা গরমে গ্রীষ্মকালেও টিকে থাকত এই পিটুনিয়া। দেশে ফুল করবার যুদ্ধ উল্টো। আমার এই উইস্কনসিনে শীতকালে কিছু করা যায় না , রাজশাহীতে গরমকালে শুধু বেলি, গন্ধরাজ, কৃষ্ণচুড়া - ডালিয়া নেই, চন্দ্রমল্লিকা নেই, গাঁদা নেই। খাঁ খাঁ রোদ।

বারান্দার বামদিকটায় বিশাল এক মাধবীলতা, হালকা গোলাপি, গাঢ় গোলাপি, সাদা মেশানো তার রং। আমরা মাধবীলতার পাপড়ি ছিঁড়ে হাতের নেলপলিশ দেওয়া নখ বানাতাম। কত যে ঢং! বারান্দার ডানদিকটায় জুঁইফুলের বিরাট লতা।আমাদের শোওয়ার ঘরের পাশেই। মাতাল মাতাল লাগত পাগলকরা গন্ধে। আর চাঁদ উঠলে তো কথাই নেই। গলা ছেড়ে সবাই মিলে গান ধরতাম, 'চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলো, ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধসুধা ঢালো।'

শুধু ফুলই নয়। বারান্দার উপর লাউ ঝুলছে। রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আমাদের বাড়ির পাশেই। দেয়ালে ইঁটের সিঁড়ি করা। বিকাল হলেই ছেলেরা ওই সিঁড়ি বেয়ে আমাদের ক্যাম্পাসে বেড়াতে আসতো। ধপাস শব্দ। কি ব্যাপার। দোতালার বারান্দায় দাদুভাই-এর লাউ দেখে আকাশে চোখ রেখে হাঁটতে গিয়ে একটি ছেলে পপা
ধরণীতল।


(১৫)

দাদুভাই-এর গ্রীন থাম্ব পেয়েছে কুংকিমা (আমার মেজমাসি) । ঢাকায় শ্যামলীর বাড়ি অনেক বড়। কিন্তু জমি কই? পিছনে আছে প্রিয় কুকুর সুজির বাঁধানো কবর। তার পাশে দোলন চাঁপার ঝাড় । যেন সুজি ভালোবাসার গন্ধ পাবে। আছে শেফালী ফুল, কিছু পাম গাছ - এই।

তাই চারতলার উপরে ছাদে ফুলের আর সবজির মেলা কুংকিমার। যেখানে বাংলাদেশে বেশির ভাগ হিন্দু ভাড়া বাড়িতেই পুরো জীবন কাটিয়ে দেয় অনিশ্চয়তার কথা ভেবে, সেখানে কোন হিন্দুর চারতলা বাড়ি বিস্ময় জাগায় বৈকি। সাহস আছে!

চারতলার উপর চারপাশে ফুটে আছে মেরুন ডালিয়া , রক্ত গাঁদা, হলুদ গাঁদা, সোনালী গাঁদা, বসরাই গোলাপ, হাস্নাহেনা, লিলি, সন্ধ্যামালতী, ঝুমকো জবা, পুটুস, জুঁই, বেলি, হলুদ কলকে ফুল , দোপাটি , কৃষ্ণচূড়া ।

টব ছাড়াও ড্রামগুলোকে অর্ধেক ক'রে মাটি ভরা হয়েছে। তাতে লাগানো হয়েছে আম, ডালিম, কামরাঙ্গা, শিউলি ফুল, জামরুল, আমড়া। ডালিম আর আম ধরে আছে। গাছের নীচে থানকুনি পাতা। আমের মুকুলের মিষ্টি গন্ধ ঢাকা শহরের লোহা, ইঁট, কাঠ, চুন, সুঁড়কির জঙ্গলে কোমল কোন ভোরের কথা মনে করিয়ে দেয় । ডালিম ফুলের লাজরাঙা মুখ অপুর্ব সুন্দর। ধরে আছে লাল লাল করমচা। আর আমরাও হাততালি দিয়ে দিয়ে 'আয় বৃষ্টি ঝেঁপে ধান দেব মেপে, লেবুর পাতায় করমচা, যা বৃষ্টি ঝরে যা'

একবার এই ছাদে দাঁড়িয়ে আমি খুব বড় একটা সোনালী রঙের চাঁদ দেখেছিলাম। ঢাকায় আজকাল চাঁদ খুঁজে পাওয়া যায় না। চারপাশের মাল্টি স্টোরিড ব্লিডিং -এর জন্য ঘরের ভিতর রোদ আসে না, চাঁদের আলোয় ভেসে যায় না মেঝে।

কুংকিমার বাগানে গমের প্লাস্টিকের বস্তাও পিছিয়ে নেই। খালি বস্তা গুলোতে মাটি ভরে লাগানো হয়েছে কালো বেগুন, সাদা বেগুন, বেগুনি বেগুন। আকাশের দিকে মুখ ক'রে তাকিয়ে আছে ঢেঁড়স। ছাদের উপর মাচা ক'রে ঝুলছে কচি লাউ। আড় মাছের মাথা দিয়ে কি ভালো যে লাউ রান্না ক'রে কুংকিমা। উপরে ধনে পাতা ছড়িয়ে।

আসলে দিদার রান্নার হাত পেয়েছে কুংকিমা। পাঁচমিশালি লাবড়া, পায়েস , লুচি, রুই মাছের কালিয়া, চিঙড়ি মাছের মালাইকারি , পাবদা মাছের জিরা দিয়ে ঝোলআর আজকাল ক'রে ইলিশ পোলাও। বাড়িতে এমন আর কেউ নয়।

একবার আমার অসুখ হয়েছে। আমি রাজশাহীতে আর মণিমা(আমার ছোটমাসি), কুংকিমা ঢাকায়। বাস স্ট্রাইক চলছে। তাতে কি? অনেক অনুনয় বিনয় ক'রে এক ট্রাকওয়ালাকে বলে ট্রাকে চেপে বসল কুংকিমা আর মণিমা। আমাকে যে দেখতেই হবে। মণিমা কিছুটা সৈনিক মত। অবাক হলেও বিশ্বাস করতে পারি মণিমার ট্রাকে চেপে বসা। কিন্তু কুংকিমা? সবসময় খুব নরম মত মানুষ বলেই তার নাম ডাক।

কত গল্প শুনেছি। অসম্ভব সুন্দরী। নিষ্পাপ প্রতিমা যেন। ঢাকা ইউনিভার্র্সিটিতে তখন পড়ে। খুবই অল্প সংখ্যায় মেয়ে তখন। এক নামে সবাই চেনে। ছুটিতে বাড়ি গেছে।

দিদা তখন দুপুর হলেই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে শাড়ি কিনত। এইসব ফেরিওয়ালা আসত যখন বাড়িতে শুধু মেয়েরা আছে তখন । যা খুশি গছাত। দিদা তো মুক্তাও কিনেছে অনেক এভাবে। পরে দেখা গেছে অবশ্য ওগুলো সব নকল। দাদুভাই-এর ট্রাঙ্ক থেকে দিদা চুপিচুপি পয়সা দিয়েছে জগতের সব ফেরিওয়ালাকে। দিদার বক্তব্য , "তোর দাদুকে কি বলব? চাইলে নানা প্রশ্ন করবে। তার চেয়ে এভাবে ই ভালো। আসলে তোর দাদু সামনে দিয়ে সুঁচ যেতে দেবে না, পিছন দিয়ে হাতি গেলেও জানতে পারবে না। "

শাড়ি তো কেনা হ'ল। কুংকিমার আবদার সবার শাড়ি সেই পড়বে সবার আগে। কিন্তু নতুন তাঁতের শাড়ি। কুংকিমার ননীর মত নরম পা। পাড়ে লেগে পা কেটে গেল। রক্ত ঝরছে। আমার এই কুংকিমা শুধু আমাকে দেখবার জন্য আজ ট্রাকে চেপে বসেছে।

মণিমার কথা আর একদিন বড় ক'রে বলব। আজ শুধু বলি তখন আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা। আমি খুব ভয় পাই পরীক্ষাকে । মণিমা তখন রাজশাহীতে মুনসেফ। এক মাস আর্নড লিভ নিয়ে ফেলল আমার জন্য। আমি নিজের মেয়ে নই। বোনের মেয়ে। আমি আমার নিজের ছেলে মেয়ের পড়াশোনার জন্য আজ পর্যন্ত কোনদিন এক মাস ছুটি নেই নি।

আমার অস্তিত্বের কারণ এইসব মানুষের ভালোবাসা। আমার নি:শ্বাস নেওয়ার কারণ এইসব মানুষের ভালোবাসা।

তাই যখন দেখি পুরো পৃথিবীটা আসলে ঠিক এমন ভালোবাসায় ভরা নয়, সেখানে মমতা নেই, স্বার্থপরতা জীবনের মূলমন্ত্র -আমি চমকে যাই। দু:স্বপ্নগুলো মেনে নিতে পারি না। আসলে যুক্তি দিয়ে, প্রমাণ দিয়ে পৃথিবীর বহু মানুষের বিশ্বাসই বদলানো যায় না । তারা যাকে সত্য বলে মনে করে তা মিথ্যা হলেও সেটাই তাদের কাছে সত্য। বড় অসহায় লাগে। তবু পৃথিবীতে খারাপ মানুষগুলো জিতে যায়। তারা ভালো মানুষগুলোকে কামড়ে আঁচড়ে রক্ত বের করে শিস দিতে দিতে চলে যায়। বিষাক্ত এই মানুষগুলোই পৃথিবীতে টিকে থাকে। খুব কমই তারা তাদের পাপের শাস্তি পায়। বংশ পরম্পরায় ইতিহাসের পুনরাবৃতি ঘটে। মানুষ সামনে না এগিয়ে ঘুরে ফিরে আবার পিছনের দানবটুকুই হ'যে যায়। আপেল কখনো গাছ থেকে বেশি দূরে পড়ে না। আমি বিধ্স্ত হয়ে যাই।

খুব একটা সাদা বিছানার কথা মনে পড়ে। হাসপাতালের । আজকাল খুব এমন হয়। ছেলেবেলার মানুষগুলোর ভালোবাসা দূরে ফেলে এসেছি। মনে হয় হাসপাতালের বেডে গিয়ে শুয়ে থাকি। ছেলেবেলায় হাসপাতালে যেতে খুব ভয় করত আমার। অথচ আজকাল মনে হয় আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গাই বুঝি হাসপাতাল। ডাক্তার , নার্স যত্ন করবে। ওদের এত আপন মনে হয়। আমায় যেন তুলার চাদর দিয়ে মুড়ে রাখবে ওরা। মাথার নিচে বালিশটা উঁচু করে দেবে। গ্লাসে ক'রে অরেঞ্জ জুস্ খাওয়াবে। ধরে ধরে হাঁটাবে যেন এক বছর বয়স আমার। আবার হাঁটতে শিখব। ওরা আমার সব ওষুধের নাম জানে। তা কখন খেতে হ'বে তাও জানে। নিজে নিয়ে নিজের ওষুধ খেতে হবে না। ছোট্ট একটা প্লাস্টিকের কাপ-এ করে নীল, গোলাপি ওষুধ নিয়ে আসবে নার্স। জলটুকু পর্যন্ত দেবে। ইনজেকশন দিলে অল্প রক্ত বের হবে, বেশি তো না। তাও আবার ওরা তুলা দিয়ে মুছে নেবে। শরীরের চাদরটা ঠিক ক'রে দেবে। ডাক্তার বার বার এসে জানিয়ে যাবে আমি কত ভালো ভাবে সেরে উঠছি। কিছুদিনের মধ্যেই আবার জীবনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারব। জীবন, লোভনীয় জীবন। যে জীবনের জন্য আমি ছেলেবেলায় কমলালেবু খেতে ভালোবাসতাম। ভাবতাম বুঝি সূর্য শুষে খাচ্ছি। জীবনের রস আমার জিহবা ভিজিয়ে দিত। চোখ বুজে আসত। হাসপাতালে আমার ঘরটার একটা পুরো দেয়াল জুড়ে কাচের জানালা। স্বচ্ছ সি থ্রু সাদা পর্দা । বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি দেখতে থাকি হাসপাতালের বাগানে অনেক লাল রঙের টিউলিপ ফুটে আছে। আজকাল হাসপাতাল ছেড়ে বাইরের পৃথিবীতে যেতে বড় ভয় ক'রে আমার।

(১৬)
কুংকীমার কথা বলতে গিয়ে আমার অনিল মেসোর (মেজো মেসো) কথাও বলতে ইচ্ছে করছে। আজ কিছুদিন হল চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মেসো হসপিটালে। আমি জানি মেসোকে কিছু কাবু করতে পারবে না। মেসো ঠিক ভালো হয়ে যাবে।
খুব ছেলেবেলায় মেসোর বাবা মারা গিয়েছিলেন। মেসো একমাত্র ছেলে। দিদি আছে। টাঙ্গাইলের মানুষ। টাঙ্গাইলের মানুষ বড় পায়েস খেতে ভালোবাসে। খেজুরের গুঁড়ের ঘিয়ে রঙের পায়েস নয়। ধবধবে সাদা চিনির পায়েস। কিশ্‌মিশ্‌ দেওয়া। মেসোরও পায়েস বড় প্রিয়। সবসময় দেখেছি দিদা পায়েস করলে মেসোকে একটা বাটিতে করে একটু বেশীই পায়েস দিত। জামাই মানুষ। মেসোও ঠোঁটের পাশ দিয়ে অল্প হেসে, ‘না না মা, অত লাগবে না।বাঙ্গালী সমাজে জামাই শাশুড়ির সম্পর্ক এক আশ্চর্য সম্পর্ক। বড়ই মধুর। শাশুড়ি, বৌ-এর সম্পর্ক যদিও তেমন নয়। বৌ-এর খুঁত ধরা শাশুড়িদের পাস্ট টাইম নয়, মেইন এক্টিভিটি। তবে এমন শাশুড়িও দুএকজন দেখেছি যাঁরা তুমি আমার নিজের মেয়ের মতলেখা ভরে জন্মদিনে বৌমাকে শুধু লোক দ্যাখানো কার্ড পাঠায় না, সত্যিকারের মেয়ে ভেবে জ্বরের সময় বৌমার মাথার কাছে বসে থাকে, বৌমার কাপড় চোপড় নিজ হাতে ধুয়ে দেয়। আমার প্রাণের বন্ধু ভিজি’র শ্বশুরমশাই ওকে ইডলি, দোসা বানিয়ে খাওয়াত। আজ উনি চলে গেছেন। আমার বন্ধুটি শ্বশুরমশাই-এর জন্য খুব কাঁদে। তবে বেশীর ভাগ মানুষেরই সে সৌভাগ্য হয় না। এমন জামাই ও আছে যারা নিরীহ শাশুড়িকে সহ্য পর্যন্ত করতে পারে না। ভালোবাসা ছড়িয়ে দিলে বেড়ে যায়, কমে না।
শুনেছি পকেটে বারোটা টাকা নিয়ে অনিল মেসো টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা শহরে এসেছিলেন। বাবা নেই, হাত ধরে নিয়ে যাওয়ার কেউ নেই।  নিজের চেষ্টায় আজ এতদূর। চার্টাড একাউন্টেন্সি ফার্ম করেছেন । এত অবাক লাগে এইসব মানুষকে দেখে! কিভাবে শূন্য থেকে নিজেকে গড়ে তোলে কেউ? ভিতরে কি পরিমাণ আকাঙ্ক্ষা থাকলে তা সম্ভব? কতটুকু পরিশ্রমী হতে হ? তার উপর বাংলাদেশের একজন হিন্দু মানুষ!
নিজে খুব কষ্ট করে জীবনের এই অবস্থায় এসেছেন বলেই বুঝি জয়, শুভ, মৌটুসি কাউকে কোনদিন কোন কষ্ট পেতে দেন নি মেসো। সবকিছু সবসময় নিজে করে দিয়েছেন। কোনরকম অর্থনৈতিক কষ্ট যেন ওরা কখনো না পায় । আকাশ থেকে সুখ কিনে এনে  ছেলেমেয়েদের হাতের মুঠোতে তা ভরে দিয়েছেন। আমাদের বাবা ছিল না বলে আমি আর শ্যামাও সেই সুখের ভাগ পেতাম । মৌটুসীর জন্মের আগে মেসোর হাঁটুর উপর চেপে চকোলেট খাবার কথা এখনো মনে পড়ে। 
টিকাটুলির বাসায় ঠাকুমা মেসোর মা থাকতেন মেসো, কুংকীমা, জয়, শুভর সাথে। ঠাকুমার সোনার মত গায়ের রং। মৌটুসিও সে রং পেয়েছে। দেখতেও ও অনেকটা ঠাকুমার মত। ঠাকুমা বিধবা মানুষ। সাদা শাড়ি পড়েন, নিরামিষ খান। কিন্তু শুভর অত্যাচারে আর দুষ্টুমিতে জীবন ঝালাপালা। শুভর ছেলে অর্জুন আজ নিজেকে স্পাইডারম্যান মনে করে, তাই সম্মান রাখতে শুভর কান্ডকারখানা আর বিস্তারিত নাই বা বলি। শুধু বলি ও বিচ্ছু ছিল। ঠাকুমার জলের কলস থেকে শুরু ক’রে কোন কিছুই শুভ’র দুষ্টামি থেকে রেহাই পায় নি।
জয়, শুভদের পিসীর ছেলেমেয়েরা আসত, যেত, থাকত কুংকীমার বাসায়। অনিতা দি, দুলু দা, বাবুল দা, ঝুনুদি,চানুদা,বুড়িদি...সবচেয়ে ছোট টুকু থাকত কুংকীমাদের সাথেই। আমার সমবয়সী বলে খুব ভাব ছিল ওর সাথে আমার । টিন এইজ বয়সের জীবনের গভীর রহস্য জানতাম টুকুর কাছ থেকে। ঝুনুদি খুব আদর করত মৌটুসিকে। মৌটুসীর পায়ে লাল রঙের নেল পলিশ লাগিয়ে দিত। আর দুলুদার কাছে আমাদের কত যে আবদার।
শ্যামলীর বাসায় আসবার পর থেকে দিদা আর মা তো একই বাড়ির তিনতলায় । মেসো প্রতিদিন সকালবেলা কুংকীমার ছাদের বাগান থেকে ফুল তুলে দিদাকে দিয়ে বলতেন, ‘মা, আপনার পূজার ফুল। আজ পান লাগবে?’
দিদার পানের ডিব্বা থেকে পান, জর্দা, শুপারির গন্ধ ভেসে আসত। সুখের গন্ধ, ভালোবাসার গন্ধ বড় সংক্রামক। শাশুড়ি মাও যে নিজেরই মা ।


(১৭)

মার ভাইবোনদের মধ্যে দাদুভাই-এর গ্রীন থাম্ব পেয়েছে আর একজন। বাপিমামা(আমার সবচেয়ে ছোট মামা) এই সুদূর আমেরিকায় বসে দেখবার মত তার দেশী শাক-সব্জীর বাগান। পিভিসি পাইপ দিয়ে মাচা করে তাতে ঝুলছে লাউ। ঝিঙ্গা, পালংশাক, লালশাক, পুঁইশাক, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, ঢেঁড়স, বড় বড় সাদা দেশী মূলা, টমেটো কি নেই সে বাগানে। আছে বিরাট গন্ধরাজ লেবুর গাছ। মামী মুশুরীর ডাল করলে গাছ থেকে সেই লেবু পেড়ে সাথে সাথে খাওয়া। এত বছর ধরে যে প্লাম গাছটা ছিল, এবার পোকা হওয়ায় তা কেটে ফেলতে হয়েছে। প্রিয় গাছ হারানোর শোক স্বজন হারানোর মতই। কী মিষ্টি যে ছিল এই প্লাম। এত রস! মা তো সব সময় বলত, ‘নিয়ে এসে বেসিনে মুখ রেখে খা চারদিকে রস পড়বে। অনেক প্লাম ওয়াইন বানিয়েছে বাপিমামা এই প্লাম থেকে।
তখন আমরা ছোট। ভট্‌, ভট্‌, ভট্‌। আকাশ ফাটানো দারুণ শব্দ। কি ব্যাপার? বাপিমামা ঢাকা থেকে রাজশাহী আসছে চার বন্ধু নিয়ে। তখন বুয়েটের ছাত্র। মোটর সাইকেলের সাইলেন্সর খুলে নিয়েছে যেন সবাই জানতে পারে। সেবার বাপিমামা আমাদের অবাক করে দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে চখা শিকার করতে গেল। এখনো দেখি শিকার করবার নেশাটা বাপিমামার আছে। ডিপ সি তে যায় মাছ ধরতে। সে সব মাছ আমার থেকে লম্বা।
দিদার কাছে সবসময়ই বাপিমামার দস্যিপনার কথা শুনেছি  ছেলেবেলায় বাপিমামা আর কাজলমামায়(আমার বড় মামা)এদিকে তো খুব ভাব। কিন্তু মারামারিতেও কম যায় না । রাতে মাথার কাছে বাটি নিয়ে ঘুমাত। রাতে উঠে নাকি দাদাকে কেটে ফেলবে। বাপিমামা ঘুমালে মাথার কাছ থেকে বটি সরানো দিদার এক কাজ। আমি তাই ভাবি। এমন কান্ড আমার ছেলেমেয়ে করলে আমি বুঝি বাকি জীবন ট্রমাতেই ভুগতাম। দিদা নির্বিকার। পাঁচ ছেলেমেয়ে। একটু দুষ্টামি তো ওরা করবেই। বড় হলে নিজেই শান্ত হবে। ওত উথাল পাথাল করবার কি আছে?
এদিকে দস্যি হলে কি হবে? যখন বুয়েটে পড়ে তখনো দেখেছি বাপিমামা রাজশাহী এলে দিদার কাছে গুটিসুটি মেরে ঘুমাত। আর দিদার বাড়ি তো আমাদের পাশেই। মানে দিদার বেডরুম আমাদের পাশের বেডরুমেই। আমিও তো। মার সাথে ঝগড়া হয়েছে। ব্যাস, চললাম। দিদার বাড়ি। পাশের ঘরে। দিদার খাটের পাগুলো গোল গোল করে কেটে বানানো। গাঢ় খয়েরী রঙ সে খাটের । জানালার পাশেই দিদার খাট রাখা।শীত, গ্রীষ্ম বারো মাস জানালা খুলে ঘুমায় দিদা। দম নাকি বন্ধ হয়ে আসে তা না হলে। মীরাদিদাও এমন। দিদার পাশে শুয়ে দিদার নরম তুলতুলে মোটাসোটা হাত নিয়ে খেলা করতাম আমি। চামড়ায় অনেক ভাঁজ বয়সের ভারে। এক একটা ভাঁজ যেন জীবনের ফেলে আসা বছরগুলোর অভিজ্ঞতা। গাছের গায়ের রিং-এর মত? আমি নিশ্চিন্ত মনে দিদার পাশে ঘুমিয়ে পড়তাম। বর্ষিয়সী জীবনের অভিজ্ঞতা আর ভালোবাসা এমন করে পুরোটা জীবনই আমাকে ঘিরে রেখেছিল। আমি নির্ভয়ে নিঃশ্বাস নিতে পেরেছিলাম। যেন কখনো কোন চিন্তা নেই। মাথার উপর একটা হাত আছে। নরম তুলতুলে। চামড়ায় অনেক ভাঁজ বয়সের ভারে।
বাপিমামা তার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারীং-এর সব পড়াশোনাও দিদাকে বোঝাত। রাজশাহী বাসার বারান্দা থেকে দেখা যায় যে জলের ট্যাঙ্ক, কিভাবে তা বানানো হ? কিভাবে তা কাজ করে? দিদা সব বুঝে যাচ্ছে। দাদুভাই-এর কি মুচকি হাসি! তুমি এখন জলের ট্যাঙ্কের কারুকার্য-ও বুঝে যাচ্ছ?’ ‘বুঝব না কেন? কেউ ভালো করে বোঝাতে পারলে পৃথিবীর সব জিনিস বোঝা যায়।দিদা পড়তে খুব ভালোবাসত। ননস্টপ পড়া। বই নেই পাশে। তাতে কি? হলুদ, লবণ এসেছে যে ঠোঙা করে তাই পড়ে ফেলি।দাদুভাই বলত, ‘ঠোঙা সাহিত্য।কত রান্না যে পুড়েছে এই ভাবে। দিদা ইংরেজী বই ও পড়ত। স্কুলের বেশি আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ হয়নি দিদার। বিয়ে হয়ে গেছে পনেরো বছর বয়সে। কিন্তু কি অসীম উত্‌সাহ পড়াশোনা করবার। পি এইচ ডি করবার সময় যেসব পি এইচ ডি থিসিস আনত মা রেফারেন্স হিসাবে পড়বার জন্য, মার আগে দিদার তা পড়া শেষ। কতটুকু কি বুঝত দিদা জানি না, কিন্তু বই-এর নেশা থেকে দূরে রাখতে পারেনি কেউ কোনদিন তাঁকে। যারা বই পড়ে তাদেরও খুব ভালোবাসত দিদা। নাত জামাই লালকে একটা সোনার জল করা বুকমার্ক দিয়েছিল দিদা। জীবনের ভালোবাসা চোখের জল নয়, সোনার জলেই মোড়া থাকে।
তখন বাপিমামা ঢাকায় চাকরি করে কিন্তু হঠাত্ কি ব্যাপার? রাত প্রায় পার রে বাড়ি ফিরছে কাজলমামার সাথে থাকে মহাচিন্তা কত কি খারাপ কথা মনে আসে খোঁজ খোঁজ খোঁজ পরে জানা গেল বাপিমামা দুটো চাকরি নিয়েছে একটা চাকরিতে কাজপাগল বাপিমামার কাজ কম য়ে যাচ্ছিল?
বাবার খুব প্রিয় ছিল বাপিমামা। আর বাপিমামারও দাদাবাবু। বাবা আজ নেই। কিন্তু অসম্ভব প্রাণোচ্ছল মানুষ বাবার অন্ধ ভক্ত বাপিমামা সেই তেমনই আছে। এই সেদিনও আমায় বলল, ‘দাদাবাবুর কাছে দিদির পরেই ছিলাম আমি।আমার মনে হল বাপিমামা বুঝি সেই বুয়েটের ছাত্র জীবনেই ফিরে যাচ্ছে। সেই রমনাতে একসাথে হেঁটে চলা আর তারপর বাপিমামার ভাষায় ফ্রিতে খাবার খাওয়া। হোস্টেল জীবনে বাসার রান্না খাবারের লোভ কেউ ছাড়ে না।
হঠাত একদিন বাপিমামার কাছ থেকে ফোন এল। তখন আমাদের বাসায় ফোন ছিল না। প্রতিবেশীর বাসায় পড়িমড়ি মার দৌড়। বাপিমামার গলা বাবাকে বল দশ হাজার টাকা দিতে। প্রশ্ন করা যাবে না কেন।তখনকার দিনে দশ হাজার টাকা অনেক টাকা। মা, দিদা সবাই দাদুভাইকে বলল, ‘এটা কি ঠিক হবে? কিছু না জেনে এতগুলো টাকা দিয়ে দেবে?’ দাদুভাই-এর উত্তর, ‘হয় টাকা যাবে নয় ছেলে যাবে। টাকাই যাক।প্রশ্ন না করে বাপিমামাকে দশ হাজার টাকা দিয়ে দিল দাদুভাই। পরে জানা গেল বাপিমামা দুবাই গেছে। দুবাই গিয়েও কত যে কান্ড! পরবর্তী জীবনেও সবসময়। অথচ এইসব নিয়েই কবিতা মামী বাপিমামার সাথে সুখে সংসার করে যাচ্ছে ।

দুবাই থেকে কত কি যে পাঠাত আমাদের বাপিমামা। আমার লাল রঙের সাইকেল। অমন সাইকেল ক্যাম্পাসে কারো ছিল না। রোলার স্কেটস এল। সেও শুধু আমাদেরই আছে। এক পা যেতে পারি না। তাতে কি? আর কারো তো নেই। মনিমার লম্বা চুলের জন্য কমলা রঙের হেয়ার ড্রায়ার। বাপিমামা দিদাকে দিল ফ্রিজ আর টিভি। এগুলোও তখন ক্যাম্পাসে কোন বাড়িতেই ছিল না দাদুভাই-এর প্রতিদিন ফ্রেশ ফেশ বাজার করবার নেশায় আমাদের বাসার ফ্রিজে বেশির ভাগ সময় যদিও শুধু জল রাখা হত। রাজশাহীর গরমে ঠান্ডা জলের বোতল আমরা কিছুক্ষণ গালে ছুঁইয়ে রাখতাম, তারপর ঢক্‌ ঢক্‌ করে খেতাম। কিন্তু বই-এর পরই দিদার টিভির নেশা হয়ে গেল । উলের সোয়েটার বুনতে বুনতে টিভির সামনে বসে থাকা দিদার চেহারা মনে করবার জন্য আমার কখনো চোখ বন্ধ পর্যন্ত করতে হয় না। সন্ধ্যা হলেই বন্ধুরা আমাদের বাড়ি আসত। সবাই মিলে মাটিতে চাদর পেতে বসে বিটিভি তে টারজান দেখতাম। ও ও ঔ---। আর দুধ জমিয়ে নতুন পাওয়া ফ্রিজে আইস্ক্রীম বানানো হত। কিভাবে আইস্ক্রীম বানাতে হয় জানতাম না, তাতে যে ক্রীম দিতে হয় তাও জানতাম না। শক্ত ইঁটের মত দুধের কিউব, তাই আমরা চেটে চেটে খাই। আবেশে চোখ বুজে আসে। 

(১৮)
আজ ৯ই মে। হৈ-এর জন্মদিন। ১৭ বছর আগে এই দিনে দেখি মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে মা। ছোট্ট হৈ-কে কোলে করে দেখাচ্ছে আমাকে। আমি হসপিটালের বেডে, অনেক কমপ্লিকেশনস্‌ হয়েছিল হৈ-এর জন্মের সময়। মা-র চোখে জল। তার নিজের মেয়েটা মরে যাবে নাতো? বাচ্চাটা?
আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে আমার ননদ মৌ। দাঁড়িয়ে আছে পথিক। ওর বর। নীল রঙের বেলুন নিয়ে এসেছে ওরা। ইটস আ বয়।সাথে কার্ড। মা পেঙ্গুইন আর বাবা পেঙ্গুইন এর সাথে বেবী পেঙ্গুইন। মা বাবা আগলে রেখেছে বাচ্চাকে। পশুদের মধ্যে দেখি বাচচাকে আগলে রাখবার জন্য আশে পাশের অন্যদের আক্রমণ করতে। মানূষ তার সেই পশু অবস্থা পেরিয়ে এসেছে। সে নিজের বাচ্চাকে রক্ষা করতে অন্যদের আক্রমণ করে না। সে স্বার্থপর নয় । মানুষের মনুষত্ব তার নিজের অস্তিত্বকে অতিক্রম করে যায়।
মৌ চারমাসের ছোট্ট ইমনকে ওর শাশুড়ির কাছে রেখে সারারাত আছে আমার কাছে। এই প্রথম ইমনকে রেখে বাইরে থাকা। তারপরেও আমার বাকি জীবন মৌ নিরপেক্ষভাবে সবসময় আমার হাতদুটো ধরে রেখেছে। মানুষের জীবনে কত কঠিন সময়ই যে আসে। সে শূন্যে ভাসতে থাকে। তাকে বুকের কাছে আবার টেনে নেওয়ার মত মানুষ পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। চিরদিনই মানুষের ভালোবাসা আমার দুই হাতের মুঠো উপচে পড়েছে। আর ওদের ছোট মেয়ে এলা তো আগের গ্রামের বাড়িতে আমার পিছন পিছন সারাক্ষণ রবিন পাখির বাসা খুঁজে বেড়াত। অবাক হয়ে দেখত ট্রী সোয়ালোর উড়ে যাওয়া। প্রকৃতি প্রেমিক এলা।ওদের পুরনো বাড়ি ছেড়ে আসবার সময় অনেকক্ষন বাড়ির দেয়াল টা জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল ও। "I am hugging the house-it will be lonely and I miss it already."

(১৯)
হৈ-এর জন্মের পর নানা উপহার নিয়ে প্রথম এক মাসের মধ্যে ওকে দেখতে এসেছিল দূর দূর থেকে আমার বন্ধুরা। ম্যাজাই?

ওয়াশিংটন ডি সি থেকে হৈ-কে দেখতে এসেছিল বুবুন, সন্তু, চন্দন। প্রায় বাইশ ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে। আমি তো গাড়িতে দুই ঘন্টার বেশি বসে থাকতে পারি না। কিসের টানে কেমন করে  মানুষ এমনটা করতে পারে?

পারডু থেকে এসেছিল আমার প্রাণের বন্ধু নীল। ওর সাথে আই আই টি-তে থাকতে সালুয়ার বনে কত যে সাইকেল চালিয়েছি। আর সেই সাথে গলা ছেড়ে আমাদের গান, ‘হা রে রে রে রে রে, আমায় ছেড়ে দে রে দে রে।অসম্ভব মেধাবী নীল। যদিও প্রথম যখন ও এল, পরীক্ষায় বসেছি, নীল মাঝামাঝি সময়ে উঠে রওয়ানা দিল। আমি ভাবলাম,’বেচারা নীল, কিছুই উত্তর করতে পারেনি।
পরীক্ষা শেষে আমি, ‘কি রে সুবিধা হল না?’
না তো, সব উত্তর করেছি।
শুধু সেই পরীক্ষায় নয়, তারপর যতদিন খড়গপুরে ছিল, সব পরীক্ষায় পেয়েছিল নীল। যদিও টিচার ওর পেপার পড়ে দেওয়ার জন্য ওকেই ডাকত। নিজের হাতের লেখা নিজেই পড়তে পারত না ও। এতই হিজিবিজি।
বিরাট বিজ্ঞানী হয়েছে আজ নীল। তবু এখনো মনে পড়ে এস এন হলের ওই ছোট রুমে কেমিস্ট্রি পড়তে পড়তে ওর ঘুরে ঘুরে নাচ, ‘তার অন্ত নাই গো নাই, যে আনন্দে গড়া আমার অঙ্গ।ওর শরীরের প্রতিটি অণু পরমাণু নেচে উঠত অজানাকে জানবার আনন্দে। আমি ওকে মাদাম কু্রী ভাবতাম।

ওয়াশিংটন ডি সি থেকে এসেছিল আমার প্রাণের অংশ মালা। ডেটন থেকে পাঁচ মাসের নীল কে নিয়ে সুপ্রিয় ভিজি। সবাই হৈ-কে দেখবে। মালা কোথা থেকে যেন রুপার জল করা এক এলবাম জোগাড় করেছিল। উপরে হৈ-এর নাম খোদাই করে ও হাজির। প্রিয় টংসার কথা মনে করে ছোট্ট হৈ-এর জন্য মনে করে খয়েরী রঙের একটা স্টাফড কুকুর আনতেও ভুলে নি ও। ভীষন নরম তুলতুলে। ভিজি কেমন করে পাঁচ মাসের নীল কে নিয়ে এত সময় পেল জানি না। বানিয়ে আনল লেস লাগানো নীল রঙের এলবাম। এলবাম বোঝাই আমার আর হৈ-এর ছবি। যত ছবি হৈ হওয়ার পর ওদের পাঠিয়েছিলাম সব। কম্বল মুড়ে সারাদিন প্যাকেট করে রাখতাম বলে ভিজি হৈ-কে ডাকত প্যাকি বেবি বলে।
পৃথিবীতে তোমাকে জাজ্‌ করবার লোক তো কিছু কম নেই। মিথ্যাকে সত্য বানানোর লোকও কম নেই। কীটের মত এইসব মানুষ পুরোটা জীবন ধরে তোমাকে কুঁড়ে খাবে। কিন্তু বন্ধুরা? সবসময় হাতটা ওরা বাড়িয়েই রেখেছে। কোন কিছুর বিচার না করেই।


পথিক বানিয়েছিল এক অসাধারণ গাঢ় নীল আর হাল্কা নীল মিলিয়ে প্যাচ ওয়ার্ক কুইল্ট। বাংলার বাঙ্গালী সমাজে ছেলেরা যেখানে জামার একটা বোতাম খুলে গেলে তা আর সেলাই করে লাগাতে পারে না সেখানে প্যাচ ওয়ার্ক কুইল্ট? আমাদের চোখ চড়কগাছ।

হৈ-এর জন্য সঞ্চিতা বানিয়েছিল সূর্যমুখি হলুদ রঙের আর একটা প্যাচ ওয়ার্ক কুইল্ট। খুব অসাধারণ সব কুইল্ট বানাত সঞ্চিতা। ছোট ছোট গল্পের টুকরো বুনে আস্ত একটা জীবন যেন।

ইন্ডিয়া থেকে আমার প্রিয় বন্ধু সুজি ইউ এস এ এসেছিল তখন। ওর সাথে আই আই টি-র এস এন হলে কাটানো রাতের কথা মনে পড়ে। ছাদে চাদর বিছিয়ে শুয়ে আছি। ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে। ভিজে যাচ্ছি। ছাতিম ফুলের গন্ধ বুকের ভিতরটা মুচড়ে দিচ্ছে। সুজি একই দেশে এসে আমার হৈ_কে দেখবে না তা কি হয়? সুজিও এল স্টউটনের বাড়িতে। তখন হৈ-এর এক মাস মত বয়স। ও ভুলল না নেটিভ আমেরিকান ড্রিম ক্যাচার আনতে। উইলোর ডাল দিয়ে হাতে বোনা। মাঝখানে মাকড়সার জালের মত। পাখির পালক ঝুলছে। পুঁতি দিয়ে গাঁথা। নেটিভ আমেরিকানরা বিশ্বাস করে রাতের বাতাস স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্ন দিয়ে ভরা। যদি বিছানার যেখানে ভোরের সূর্য এসে পড়ে সেখানে ড্রিম ক্যাচার ঝুলিয়ে রাখা যায়, তবে তা সব ধরণের স্বপ্ন জালের ভিতর আঁকড়ে ধরে। সুন্দর স্বপ্নগুলো জালের মাঝ থেকে ধীরে ধীরে পালক বেয়ে নেমে নীচে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটিকে ঘিরে ধরে। আর দুঃস্বপ্নগুলো জালের মধ্যে আটকা পড়ে ভোরের সূর্যের আলোয় পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। আমার হৈ-এর আজ সতেরো বছর বয়স। আমি ভাবি এই সতেরো বছর ধরে ওর সব দুঃস্বপ্ন বুঝি ওই ড্রিম ক্যাচারে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আর স্বপ্নগুলো ওকে আগলে রেখেছে।

একজন বন্ধু আমাকে বলেছিল যখন খুব মন খারাপ হবে তখন লিখবি। দেখবি থেরাপির মত কাজ করবে। যত বেদনা বাড়বে তত শক্তিশালী হবে লেখা। রক্তাক্ত হয়ে যাবার মত মন খারাপ, শরীর অবশ হয়ে যাবার মত মন খারাপ আমার অনেক হয়েছে। আমি লিখেছি। তবু বারবার মনে হয়েছে যদি আমায় লিখতে না হত।

(২০)
'হ্যাঁ, এখনো হৈ-এর জন্মের দিনটার প্রতিটি মুহুর্ত মনে আছে আমার। কি ভয়ানক উতকন্ঠা।' মা-র গলা ধরে আসে।  হৈ-এর জন্মদিন আর আমার জন্মদিন কাছাকাছি। মে মাসে। আর এবার তো আমার বিগ মাইল স্টোন বার্থডে। পঞ্চাশ বছরের। মা সেভাবেই টিকিট কেটেছিল যেন দেশ থেকে এসে দু'জনের জন্মদিন করতে পারে। শেষ পর্যন্ত হ'ল না।
হৈ, তাথৈ দুজনেরই জন্মের দিন থেকে শুরু করে ছেলেবেলার অনেকটা সময় কেটেছে মার সাথে।  হৈ-কে কোনদিন ডে কেয়ারে কাটাতে হয়নি। তাথৈও জীবনের প্রথম সাড়ে তিন বছর ডে কেয়ারে যায় নি। ওরা যখন ছোট ছিল প্রথম ছয় বছর আমি চাকরি করিনি। মাঝে মাঝেই মা এসে সাহায্য করেছে। হৈ, তাথৈ খুব পিঠাপিঠি। প্রায় জমজ বাচ্চার মত। আমার তো মাথা খারাপ হয়ে যেত। মা ছিল বলে রক্ষা। আমি তো প্রায়ই বিকালে গাড়ি নিয়ে মগজে বাতাস লাগাতে বের হয়ে পড়তাম। তারপর আমি যখন চাকরি শুরু করলাম, মা গরমকালে থেকেছে। ফলে গরমকালের লম্বা তিনমাস ওরা বাড়িতে থাকতে পেরেছে। আমার সৌভাগ্য! স্টউটনের বাড়ির মাঠে আমার দুই কুকুর টংসা সিম্বার সাথে দৌড়াদৌড়ি করেছে হৈ, তাথৈ। জলের হোস নিয়ে একজন আরেকজনকে ভিজিয়েছে। বাঁধনহারা দিন উপহার পেয়েছে। আর মা শুধু বলে গেছে, ‘করো না, আর করো না।কে কার কথা শোনে! যে বছরগুলো মা আসতে পারেনি, হৈ, তাথৈ-কে সামার ক্যাম্পে যেতে হয়েছে। মিলিটারি শাসন। ঘড়ি ধরে গাছে চড়, ঘড়ি ধরে নৌকা বাও।
শুধু হৈ, তাথৈ নয়, আমার মাসতুত বোন প্রমার মেয়ে রাইকেও বাচ্চাবেলায় রেখেছে মা। প্রমা আর ওর বর শুভাশীষ কিছুতেই ভুলতে পারে না তা। পি এইচ ডি র থিসিসে লিখে দিয়েছে মা কে ছাড়া কিছুতেই ওদের পি এইচ ডি হত না।
এটা কি শাক,মা?” –লালের প্রশ্ন।
এই তো, তুমি যে ফারমারস মার্কেট থেকে এনেছিলে।মটরশুঁটির শাক। একটু বেগুন দিয়ে রেঁধেছি।
কত রকম রান্না যে করে মা। আমেরিকান সবজি আর মাছ দিয়ে দেশী রান্না। বেগুনী বাঁধাকপি, ব্রাসেল স্প্রাউটস, স্প্যাগেটি স্কোয়াস, ফেনেল, মোটা মোটা ঘ্যাঁসঘ্যাঁসে মাস্টার্ড গ্রীন, স্বাদহীন ক্যাটফিস, একমাত্র ত্রাণকর্তা ট্রাউট। বাঁধাকপির পাতা, ফুলকপির ডাঁটা, বেগুনের বোঁটা আর অন্য যে সব্জি বাঁচে তা দিয়ে করে ফেলে গারবেজ তরকারি।এই নামটা দিয়েছে আমার ছোটবোন শ্যামার বর সুজয়। ভারি মজার ছেলে ও। ধীর স্থির।ভদ্র। চিন্তায় আর ব্যবহারে বৈপরীত্য নেই সুজয়ের।দায়িত্ব নেওয়ার বেলায় দুপা এগিয়েই রেখেছে ও। অথচ অনেক বই পড়ে ফেলেছে জাতীয় আঁতলামো নেই কোন।নীরবকর্মী।ওর বক্তব্য মা যখন থাকে তখন গারবেজের পরিমাণ কমে যায়। ট্র্যাসের বিন হাল্কা হয়ে যায়। মা সব ফেলে দেওয়ার অংশ দিয়ে তরকারি রেঁধে ফেলে। গারবেজ তরকারি
ফারমারস মার্কেটে মটরশুঁটির শাক শুধু নয়, একবার পাওয়া গেল পাটশাক। কি উত্তেজনা মার। মুশুরীর ডালের ছিটা দিয়ে রেঁধে ফেলল তা।উপরে একটু ঘি দিয়ে নামাতে হয় এই শাক। পাটশাক আমার খুব প্রিয়। খেতে গেলেই দাদুভাই-এর কথা মনে পড়ে। খুব ভালবাসত  পাটশাক দাদুভাই। ডাকত ময়মনসিংহের ভাষায় নাইল্লা শাকএই নাইল্লা ক্ষেতে বসেই নাকি দাদুভাই প্রথম বিড়ি ফুঁকতে শিখেছিল। সেই সময়েও নিয়ম ভাঙার নিয়মটাই ছিল বড় হয়ে উঠবার পথ।
মানুষের সাথে কিভাবে যেন কোন কোন খাবারের স্মৃতি মিশে থাকে। মাছের তেলের বড়ার কথা যখন ভাবি খুব দিদার কথা মনে হয়। শাহী টুকরা, কমলালেবু দিয়ে কই মাছ, ফুলকপির রোস্ট, সবজি দিয়ে মুগডাল, ডিমের হালুয়া, মিষ্টি মিষ্টি মুরগির কোর্মা আর রাজশাহীতে বসে জীবনের প্রথম প্যানকেক-এর কথায় হোস্নেয়ারা মাসী। মার প্রিয় বন্ধু, আমার প্রাণের বন্ধু সুস্মির মা, বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবি আলী আনোয়ার মেসোর স্ত্রী। কত মানুষ যে কত চব্য, চোষ্য,লেহ্য, পেয় খেয়েছে মাসীদের বাসায়। শুধু কি আমরা? হয়ত আমাদের বাড়ি কোন আত্মীয় এসেছে। ব্যাস, য়ে গেল। হোস্নেয়ারা মাসীর বাসায় নিমন্ত্রণ। টেবিলের এমাথা থেকে ওমাথা খাবার।
প্রত্যেক দিন বিকালে আমরা বন্ধুরা হাজির হতাম সুস্মিদের বাসায়। ওদের রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের পশ্চিম পাড়ার বাড়ির খাওয়ার টেবিল এখনো আমার ছেলেবেলার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। চোখ বন্ধ করলেই ওদের বাসার আলুর চপের গন্ধ পাই। প্রতিদিন খেয়েছি।মাসী একবার মা-কে বলেছিল, ‘উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ে। বাইরে গিয়ে কি করবে, আমি তো চোখে চোখে রাখতে পারব না। তার চেয়ে সব বন্ধু মিলে বাড়িতেই আড্ডা দিক। জানব কি করছে।আমরাও চপ, কাটলেট খেতে খেতে মাসীর চোখের সামনে থেকে তা জানাতে দ্বিধা করিনি।
মাসীর মত উদার আর ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। ইউনিভার্সিটির কত ছেলে মেয়ের যে পড়বার খরচ দিয়েছেন মাসী। কত ছেলে মেয়ে যে সুস্মিদের বাড়িতে থেকেছে। মানুষের জন্ম যে শুধু নিজেকে নিয়ে স্বার্থপরের মত বেঁচে থাকবার জন্য নয়, মানুষের জন্ম যে নিজের পাশাপাশি অন্য কারো দায়িত্ব নেওয়ার জন্যও তা মাসী-মেসোকে দেখেই বুঝতাম। ছেলেবেলায় বহুবার ভেবেছি যদি আমার জীবনে মা বদল করবার কোনদিন সুযোগ আসে, তবে হোস্নেয়ারা মাসীকেই মাডাকব। মানুষের মহত্ব  চিরদিন চুম্বকের মত আমায় টানে। মানুষের মনুষত্ব।
শুধু আমার হৈ, তাথৈ-কে রাখাই তো নয়, অফিস থেকে বাড়ি এসে দেখি রান্নাঘরের চূলা, কাউন্টার টপ, বাথরুম, ঘরের মেঝে সব ঝক্‌ঝক্‌ করছে। মা সব ঘষে মেজে পরিষ্কার করে রেখেছে। এত বয়সে কেন এত কাজ করা বলে চীত্‌কার চেঁচামেচি করলে মার উত্তর, ‘এখানে তো আর বসে বসে ঘর মুছতে হয় না।সেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিন্ড্রেরেলা সবাই।
আসলে এখানে তো আর দেশের মত দুইজন লোক আর তাদের পাঁচজন গৃহকর্মী মত পরিস্থিতি নয়। মা আপ্রাণ চেষ্টা করে যদি আমাদের একটু পরিশ্রম কম হয়। তিয়াত্তর বছর বয়স এখন মার। তবুও মা যখন থাকে কোন রান্না করিনা আমি। সব মাই সামলায়। আর চেষ্টা করলেই কি হবে মার মত করে মুশুর বেগুন? মুশুর ডাল অল্প সিদ্ধ করে আর তাতে ছোট ছোট করে বেগুন ভেজে সব মিশিয়ে পিঁয়াজ দিয়ে ভাজা ভাজা! অমৃত।
একদিন রান্নাঘরে ঢুকে দেখি সারা মেঝেময় সব হাড়ি পাতিল, কৌটো। লাল আর মা মিলে সব ক্যাবিনেট থেকে নামিয়েছে। ঝেড়েঝুড়ে সর্ট করে আবার তুলে রাখবে দুজনে মিলে।

আমাদের রাজশাহী বাসায় একটা খুব ছোট চা বানানোর হাড়ি ছিল। চা প্রায় আঁটেই না। কোথা থেকে এল? কিসের হাড়ি এটা? মা বলল, ‘না আসলে মন্নুজান হলে যখন হাউস টিউটর ছিলাম এতে করে ভাত রান্না করতাম। তা প্রতিদিনই ভাত বেঁচে যেত।তখন বাবাকে মাত্র রাজাকাররা মেরে ফেলেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে। আমার বয়স সাড়ে চার, শ্যামার দেড়। মা রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করেছে কারো উপর নির্ভরশীল প্রাণী হিসাবে বেঁচে থাকবে না বলে। সাতাশ বছর বয়সে বিধবা হয়ে কেমন থাকতে পারে একটা মানুষ তা মাকে দেখে বুঝতে পারতাম না। কেননা মার চোখে কোনদিন জল দেখিনি আমি।একটু বড় হয়ে ওই চা-এর হাড়িতে রান্না হওয়া ভাত আর তা বেচে যাওয়ার গল্পটা ভেবে মা কেমন ছিল বুঝতে চেষ্টা করতাম। আমার দম বন্ধ হয়ে আসত।
তাথৈ সবসময় আমাকে বলে, “Dadeen is an amazing person.”  আর হৈ আমাকে একদিন বলেছিল “Do you realize? Dadeen was so young when she lost your dad? But she did not take a husband?”

আর এক মহাগুণ আছে মার। ক্যাম্পাসে কারো হসপিটালে থাকতে হবে। সাথে চলল মা। একবার মামী খুব অসুস্থ। রাজশাহীর জেনারেল ওয়ার্ডে রাখা যাবে না। কলেরা, আন্ত্রিকের রোগী যারা, তাদের স্পেশাল ওয়ার্ড। কারো সাথে মেশা যাবে না। এতই দুর্বিসহ সেই জায়গা যে রোগী ছাড়া আর কেউ থাকতে পারে না। মার  ভ্রূক্ষেপ  নেই। মামীর সাথে কয়েকটা দিন সেখানেই কাটিয়ে এল। মামী সুস্থ হয়ে, ‘দিদি, তুমি কিভাবে এ নরকে ছিলে?’ মা নির্বিকার।

দরজায় কড়া নাড়বার শব্দ। রাজশাহীতে দুপুরবেলা। দরজা খুলতেই, “মা আছে?”
আমার তো মেজাজ তিরিক্ষি। আবার একজন। এমন আমার মাকে মাডাকা লোকজন অনেক ছিল। মা কারো স্কুলের খরচ, কলেজের খরচ, বই কিনবার খরচ, খাওয়া থাকার খরচ দিচ্ছে। তখন কত টাকা আর মা পেত ইউনিভার্সিটির লেকচারার হিসাবে। তার উপর বাড়িতে আমাদের এত লোকজন। কিন্তু মাডাক শুনবার লোভ কি ছাড়া যায়?

হ্যাঁ, এই হ'ল মা। স্বর্গ বলে যদি কিছু থাকে তবে সেই উজ্জ্বল জায়গা থেকে নেমে আসা এক মানুষ। সারাক্ষণই অন্যকে সাহায্য করবার জন্য হাত বাড়িয়ে রেখেছে। কোনদিন কারো অমঙ্গল কামনা করেনি। দানব নামের যে সব মানুষ মাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে শকুনের মত, তাদের পাপও ক্ষমা ক'রে দিয়েছে। সবসময় ভাবি সেই সব হতভাগ্য ছেলেমেয়েদের কথা যাদের বাবা মা-কে নিয়ে গর্ব করবার মত কিছু নেই। নিজেরটুকু আর নিজেদের ছেলেমেয়েদেরটুকু ছাড়া কোনদিন অন্যের জন্য অল্প একটুও ভাবেনি এইসব বাবা-মা, কোন স্বার্থ ত্যাগ করে নি।

কেউ যদি মা'কে অপমান ক'রে আমার মনে হয় বুঝি আমার হাত পা কেটে ফেলা হয়েছে। মনে হয় যে রক্তক্ষরণ শুরু হ, সারা জীবনেও বুঝি তা থামবে না। 'অন্যায় যে ক'রে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে। কোন শব্দটি বেশি শক্তিশালী? অভিশাপ না ক্ষমা? আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।

হৈতাথৈ ওদের দাদীনকে খুব ভালোবাসে।

(২১)
একটু সর্‌, আর একটু সর্‌, বসতে পারছি না তো।বসতে পারবার কথা তো না। আমাদের খাবার ঘর, বসবার ঘর, বারান্দা, করিডোর সব বোঝাই। মণিমা একশটা বাচ্চা নিয়ে অনুষ্ঠান করবে। কোনমতে আমরা ঠেলাঠেলি করে বসবার চেষ্টা করি।কাঁকন, পিয়া, গীতি, ফেরদৌসী, মুনা, প্যামেলা, শ্যামা, শিউলি, সিমি, কুহিন, ইরাম, এলি, দীনা, কেয়া, ক্যামেলিয়া, শাওন, নিক্কন, লুবু, শ্যামলী, মিতু, সালেহা, সুস্মি, ময়না, শিমকি, আনন্দ, টুম্পা, কুসুম, রবিন, লিসা, তানিয়া, লোপা, বিদিশা, নাজ, ইয়াসমিন,টিসা,শুচি,সুমন, চুমকি, সুরভি, শ্যামলিনা, সীমা...
আমাদের বাড়ি পশ্চিম পাড়ায়। পূর্ব পাড়া থেকে রিহারসাল দিতে আসত সুস্মি, ইয়াসমিন, প্যামেলা, সালেহা, আনন্দ, টুম্পা, কুসুম। প্রায় এক মাইল হেঁটে। পথের মাঝে পড়ত শহীদ মিনার। ১৯৭৪ সালে পোড়া ইঁটের টুকরো দিয়ে শহীদ মিনারে অপূর্ব মোজাইক করেছেন বিখ্যাত শিল্পী মুর্তজা বশীর। সন্তানেরা আত্মাহুতি  দিচ্ছে আগুনে। মার হাত থেকে ফুল ঝরে পড়ছে। তারপর সন্তানেরা আকাশের তারা হয়ে যাচ্ছে।
শহীদ মিনারের চারপাশ ঘিরে বড় বড় মেরুন, গোলাপি আর হলুদ রঙের ডালিয়া, সোনালি রঙের গাঁদা, বেগুনি বোতাম ফুল। শহীদ মিনারের পিছনের দিকটা টিলামত। তার ঢাল বেয়ে না গড়িয়ে আমরা ওই পথ পার হই না। পাশেই রাকসু ভবনের সামনে কড়ই আর শিরীষের গাছ। চুলবুলি কাটা তার ফুল। হালকা সবুজ আর গোলাপি রঙের। আলতো ভালোবাসায় চোখের উপর বুলাতাম কড়ই আর শিরীষের ফুল। আর ছিল প্যারিস রোডে আকাশ ছোঁওয়া মেঘ শিরীষ। ওয়াহিদুল হক কাকুর কাছে গাছের নাম শিখতাম আমরা।
অনুষ্ঠানের নাম ছেলে ঘুমিও না।ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো গানটার কথা পালটে আমাদের গান, ‘ছেলে ঘুমিও না, পাড়া জুড়াবে না, বর্গী আছে দেশে।এখনো মাথার ভিতর গুনগুন করে ওই সুর। ঘরে শত্রু। অস্ত্র তো হাতে তুলে নিতেই হবে।
একশ জনের অনুষ্ঠানে কি যে উত্তেজনা। গায়ক গায়িকার বয়স তিন থেকে ষোল। সাদা শাড়ী লাল পাড় পড়ে গান গাইব। নাচ হবে। চর্যাপদ থেকে শুরু করে আধুনিক সময় সব ফুটে উঠবে সেখানে। হরিপদ দাদুর ছেলে অনুপমামা তবলা বাজাবে। অসাধারণ মিউজিক সেন্স অনুপমামার। রাজশাহীর বিখ্যাত উচ্চাঙ্গ সংগীতের ওস্তাদ হরিপদ দাস। মনিমা বহুদিন হল ওঁনার কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখে। খুব একনিষ্ঠ ছাত্রী। ভোরবেলা উঠে রেওয়াজ করে, বিকালবেলা রেওয়াজ করে। গলা খুসখুস করলে বড়ই-এর পাতা গরম জলে সিদ্ধ করে সেই জল খায়।কিন্তু সবাই তো আর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ভালোবাসে না। সা শুনলেই তাদের যা রে যাবলতে ইচ্ছা করে। এমনই এক প্রতিবেশী তো শেষ পর্যন্ত বলেই বসল মণিমাকে নাকি চাঁদা তুলে অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়ে দেবে। সব ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া কেন? কোয়ালাদের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শেখাবে?

স্টেজের পিছনে ছায়াচিত্রের মত করে বেবীআপা বসে আছে কোলে সন্তান নিয়ে। দেশমাতৃকার প্রতিচ্ছবি। আর আমরা গেয়ে চলেছি, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল রক্ত লাল।

সেদিন ঘেঁষাঘেঁষি করে একশ জন বসেছিলাম পাশাপাশি। তারপর প্রায় চল্লিশ বছর কেটে গেছে। মানুষের খুব কাছে বসবার উত্তাপটুকু মনে আছে আর সেই সাথে গানের সুর।
(২২)

মন্নুজান হলের রুমে রুমে ঘুরে আমরা টিকিট বিক্রী করছি। হরিপদ দাদুর জন্য অনুষ্ঠান। ওঁনার শরীর ভালো নেই। অনুষ্ঠান করে যা হবে তা ওঁনার চিকিতসায় যদি অল্প হলেও কোন কাজে লাগে। বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী রফিকুল আলম হরিপদ দাদুর ছাত্র ছিলেন। তিনি আসবেন গান করতে। গান করবে তাঁর স্ত্রী প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী আবিদা সুলতানা। গাইবেন বিপুল জনপ্রিয় এন্ড্রু কিশোর। আর শুরুতে আমাদের - বাচ্চাদের সমবেত সংগীত। টিকিট বিক্রী করে আমাদের সোয়েটারের পকেট, প্যান্টের পকেট উপচে পড়ল। মণিমা জানাল চল্লিশ হাজার টাকা জোগাড় হয়েছে। তখনকার সময়ে চল্লিশ হাজার টাকা অনেক টাকা। এ ছিল আমাদের ছেলেবেলার জীবনের এক ভীষণ বড় অর্জন।
সিরাজউদ্দৌলা নাটক হবে। আমার ক্লাশমেট আজাদ হবে সিরাজউদ্দৌলা।মনসুর-উল-মুল্‌ক সিরাজউদ্দৌলা হাইবাত জং। বাংলার নবাব আলিবর্দী খাঁর যৌগ্য দৌহিত্র বাংলার স্বাধীন নবাব আর বিহার, উড়িষ্যার নিজাম মির্জা মোহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলা ।ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী দুই শত বছর ধরে বাংলা শাসন করবার আগে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা । এখনো আজাদের ঔদাত্ত গলা কানে ভাসে। বড় ভালো অভিনয় করেছিল ও। গায়ে কাঁটা দেয় বাংলার পরাজয়, শিকল পড়া দেখে। গলা বুজে আসে। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন ভাগিরথী নদীতে, পলাশীর প্রান্তরে দুইশবছরের জন্য ডুবে গিয়েছিল বাংলার সূর্য । পলাশীর যুদ্ধ ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে আমাদের হৃত্‌পিন্ড রক্তাক্ত করে দেয়। অল্প বয়সে ইতিহাস রক্ত ঝরায়। দিনে দিনে মানুষের স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধও কিভাবে যেন মানুষ ভুলে যায়। ভুলে যায় কে তার শত্রু ছিল। মীর জাফররা আজও জিতে যায়।
আলেয়া হয়েছিল লিসা। আজকের বিখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা। এখন ওর গান শুনে চোখে জল আসে। বুকের ভিতরটা মুচড়ে দিয়ে যায় ওর সুর। কিন্তু ছেলেবেলায় শুধু গান নয়, অসম্ভব ভালো নাচ আর অভিনয় করত লিসা। আমাদের নাটকে লিসাকে নাচ শিখিয়ে দিয়ে গেলেন বাদল মাষ্টার। আলেয়া লিসা ছাড়া আর কাউকে মানাত না। কী গান, কী নাচ, কী অভিনয়। নাজ তো আজ জানালো লিসা নাচের সাথে নিজে গান গেয়েছিল,
"কেন প্রেম যমুনা আজি হলো অধীর,
দোলে টলোমলো রহে না স্থির।"
দর্শকের সারি থেকে একজন পাঁচশ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করল আলেয়ার অভিনয় দেখে। তখনকার দিনে পাঁচশ টাকা? একজন সোনার চেইন-ও ঘোষনা করল। আমাদের তো চোখ ছানাবড়া।
লিসার দাদা টিয়াজ হয়েছিল গোলাম হোসেন। আজ টিয়াজ অনেক বড় ডাক্তার হয়েছে। সেই সাথে বড় রবীন্দ্র-সঙ্গীত শিল্পী ইমতিয়াজ আহমেদ। কিন্তু এখনও মনে পড়ে গোলাম হোসেনের ভূমিকায় টিয়াজকে। আর ওর লম্বা কুর্নিশ।
প্লেটো হয়েছিল মোহনলাল। মোহনলাল আর মীর মদন নবাবের পক্ষে প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিল। মীর মদনের মৃত্যুর পর মোহনলাল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে সাথে সাথে আক্রমণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সিরাজউদ্দৌলা বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের কথা শুনে মোহনলালের মতামতকে কোন পাত্তাই দেয় নি। প্লেটো কি ভালোই যে ফুটিয়ে তুলেছিল দেশপ্রেমিক মোহনলালের চরিত্র। আর মীর জাফরের চরিত্রে রোমেল। মীর মীরন সালেহা।
ঘসেটি বেগমের (মেহের-উন-নিসা বেগম) ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম আমি। ঘাগড়া আর উড়নিতে কারুকাজ। পরনে মণি মাণিক্যের শেষ নেই। প্রচন্ড ধনী সিরাজের মাসী। কিন্তু সিরাজের শত্রু।
আর শুচি বলল সিরাজউদ্দৌলার সুন্দরী স্ত্রী 'লুফা'-
চরিত্রে ছিল সুমন।
নাদুস নুদুস ভুঁড়ি নিয়ে, গলায় সোনালি পুঁতি পুঁতি মালা পড়ে হেলেদুলে জগত্‌ শেঠ হয়েছিল সুস্মি। চমকার গোঁফ।
উমিচাঁদ হয়েছিল রুমি। জগত্‌ শেঠ, উমিচাঁদ, মীর জাফর মিলে সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করায় পলাশীর প্রান্তরে পরাজয় হল স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার।লর্ড ক্লাইভ আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী জেঁকে বসল ভারতবর্ষে। সুমন হয়েছিল লর্ড ক্লাইভ।শ্যামা, পিয়া আর ছোট ছোট ওদের বয়েসী মেয়েরা সেজেগুজে লর্ড ক্লাইভের বলরুমে নেচেছিল। দুলে দুলে কী চমত্‌কার সে নাচ!
অবশেষে মীর জাফর আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর চুক্তিমত মীর জাফরের ছেলে মীর মীরনের আদেশক্রমে ১৭৫৭ সালের ২রা জুলাই সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে ঘাতক মোহাম্মদী বেগ। মোহাম্মদী বেগের কালো পোশাক আর তলোয়ারে এত চমতকার মানিয়েছিল পাপ্পুকে যে আমরা ভয়ে কেঁপে উঠেছিলাম। সার্থক অভিনয় পাপ্পুর।
ইসমাইল ভাই দারুণ মেক আপ দিয়ে আমাদের নবাব, বেগম, বিশ্বাসঘাতক, ঘাতক বানিয়ে ছেড়েছিলেন। সুস্মি তো বলল বিপুল সাফল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অনুরোধে আমরা নাকি দু'বার সিরাজউদ্দৌলা করেছিলাম। একবার নজরুল মিলায়তনে, একবার জুবেরী ভবনে।
আমাদের রিহারসাল হত লিসাদের বাসায়। ইউনিভার্সিটির প্রগতিশীল শিক্ষক মফিজ চাচা, হাসান আজিজুল হক চাচা, আলী আনোয়ার চাচা, নাজিম মাহমুদ চাচা সবাই আমাদের উত্‌সাহ দিতে, সবাই আমাদের নাটক শেখাতে উপস্থিত। মূল নির্দেশক ছিলেন জাহিদুল হক টুকু চাচা। সাথে থাকতেন সুখেন কাকু। মাঝে মাঝে কাজলার মোড় থেকে তেল চপচপ সিঙ্গারা আসত। লিসাদের বারান্দায় একতলা থেকে দুইতলা উঠে গেছে জুঁইফুলের গাছ। মাতাল করা গন্ধ। সিঙ্গারার গন্ধ না জুঁইফুলের গন্ধ কিসের টানে আমি যেতাম মনে নেই। তবে আজ যখন পাপ্পুকে জিজ্ঞাসা করলাম মনে আছে সিরাজদৌল্লা নাটকের কথা’? ও হুঁড়মুড় করে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা বলে উঠল। কারা কারা অভিনয় করেছিল সব ওর মনে আছে। যে ভালোবাসা বুকের ভিতর দাগ কেটে যায় তা সুযোগ পেলেই মাথায় মুকুট পড়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।

(২৩)

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ। গীতিকার আব্দুল গাফফার চৌধুরী।
প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে এই গান গেয়ে আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিতে যেতাম। চাচীদের পরনে সাদা শাড়ি কালো পাড়। গায়ে কালো চাদর। চাচাদের পরনে সাদা পাজামা, পাঞ্জাবী। ছোট এক টুকরো কালো কাপড় দিয়ে বানানো ব্যাজ বুকের কাছে পিন দিয়ে আঁটা। হাতে ফুল। খালি পা। প্রভাতফেরি। রাত বারোটা এক মিনিটে ফুল দিতে আসতেন ভাইস-চ্যান্সেলর, নানা রাজনৈতিক দল, ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, শিক্ষিকাবৃন্দ। সাদা আর লাল রঙে আলপনা আঁকা শহীদ মিনারের বাঁধানো চত্বর।
রীদের পর রীদে ঢেকে যেত শহীদ মিনারের সামনেটা।
আমি কয়েকবার মাত্র রাত বারোটা এক মিনিটে ফুল দিয়েছি। আমরা বাচ্চারা সাধারণতঃ ভোর ছয়টার দিকের প্রভাতফেরিতেই অংশ নিতাম। রাত বারোটা এক মিনিট থেকে শুরু করে সারাদিন নানা অনুষ্ঠান হত শহীদ মিনারে, জুবেরি ভবনে, নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে।
প্রভাত ফেরির সামনের দিকে থাকত ছোট্ট পাপ্পু। তখন বছর দুই বয়স ওর। পাপ্পু কোনদিন ওর বাবাকে দেখেনি। ওর জন্ম ১৯৭২ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি। আমাদের বাড়ির নাম্বার ছিল ডাব্লিউ-৬৭-সি। আর মাস্তুরামাসী অপুভাই, কেয়া, পিয়া, পাপ্পুকে নিয়ে থাকতেন আমাদের পাশের বাসায় - ডাব্লিউ-৬৭-ডি তে।
১৯৭১ সালের ২৫শে নভেম্বর রাজশাহী শহরের বাসা থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক; অপুভাই, কেয়া, পিয়া, পাপ্পুর বাবা; মাস্তুরা চাচীর স্বামী মীর আব্দুল কাইয়ুম চাচাকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। রাত নয়টার দিকে একটা লোক কাইয়ুম চাচাদের বাসায় গিয়ে জানায় যে তাকে বাইরে একজন আর্মি অফিসার ডাকছে। চাচা আর্মি অফিসারের সাথে দেখা করতে যান।এরপর কাইয়ুম চাচা আর কখনো বাসায় ফিরে আসেননি। তখন অপুভাই-এর বয়স ছিল সাড়ে ছয় বছর। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার দুদিন পরে ১৮ই ডিসেম্বর রাজশাহী শহরের কাছে পদ্মার চরে এক গণকবরে কাইয়ুম চাচার মৃতদেহ পাওয়া যায়। শার্ট আর হাতের আংটি দেখে মৃতদেহ শনাক্ত করা হয়।


আমাদের ফ্ল্যাটগুলোর খুব লম্বা বারান্দা ছিল। কেয়াদের বাসা আর আমাদের বাসার সদর দরজা বেশিরভাগ সময় ই খোলা থাকত। ফলে বারান্দা হয়ে যেত আরো লম্বা। অন্যান্য বন্ধুরাও যখন খুশি এসে যোগ দিত। এ মাথা থেকে ও মাথা আমরা দৌড়ে বেড়াতাম। কিত কিত খেলতাম। দাদুভাই-এর দোতালা বেয়ে ওঠা মাধবীলতা বাতাসে দুলে উঠত। ছেলেবেলা থেকে পাশাপাশি বাসায় থেকেও কোনদিন বাবা নিয়ে কথা বলতাম না আমরা। দম মনে হয় বন্ধ হয়ে আসত।


(২৪)
একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরিতে থাকতেন ঊর্মিআপা। অঙ্কের অসম্ভব মেধাবী অধ্যাপক শহীদ বুদ্ধিজীবি হবিবুর রহমান চাচার সবচেয়ে ছোট মেয়ে। মিন্টু ভাই , রুনু আপা, সীমা আপা, ঊষা আপা, নান্টু ভাই আমাদের থেকে বড় হলেও ঊর্মি আপা পড়তেন আমাদের দুই ক্লাশ উপরে, অপুভাইদের সাথে। সবাই বলত হবিবুর রহমান চাচার অঙ্কের মাথা পেয়েছে ঊর্মি আপা। খুব ভালো পড়াশোনায় উনি।
একাত্তরের যুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ছিলেন হবিবুর রহমান চাচা। নিয়মিতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। ২৫ মার্চের পরে প্রতিরক্ষা শক্তি হিসাবে ইপিআর বাহিনীর একটা অংশ ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিল।হাবিবুর রহমান চাচার বাসা থেকে তাদের জন্য খাবার ও অন্যান্য জিনিস পাঠানো হত। শুনেছি ওয়াহিদা রহমান চাচী তাদের জন্য নিজ হাতে রুটি বানাতেন।
কিছু রাজাকার যুদ্ধে হবিবুর রহমান চাচার ভূমিকা পাকিস্তানী আর্মিকে জানায়। বহু মানুষ ওঁনাকে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল। কিন্তু চাচা বলেছিলেন,'Like the captain of a ship I shall be the last to leave'বিপদ সামনে জেনেও পরিবারের সবাইকে নিয়ে 'প-১৯/বি' নম্বর বাসায় ক্যাম্পাসেই থেকে যান হবিবুর রহমান চাচা। ১৫ই এপ্রিল ব্রিগেডিয়ার আসলাম আর কর্নেল তাজের নেতৃত্বে পাকিস্তানী আর্মি হবিবুর রহমান চাচার বাসায় এসে তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। আর কোনদিন উনি ফিরে আসেন নি।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিসক এবং সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের এভাবেই নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী বাহিনী।
দেশ যখন প্রায় স্বাধীন হতে যাচ্ছে ঠিক তার প্রাক্কালে বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করবার নীল নকশাও তৈরী হয়েছিল। উদ্দেশ্য একটাই। যদি দেশ স্বাধীনও হয়, তবুও মেরুদন্ডটা ভাঙ্গা থাকবে। কোনভাবেই এগিয়ে যেতে পারবে না নতুন দেশ বাংলাদেশ।
পাকিস্তানী বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল আল-বদর, রাজাকার, আল-শামস। কিন্তু রাজাকারের দল ১৯৭১-এর যুদ্ধের সাথেই নিঃশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। আজও এইসব মীর জাফর প্রকাশ্যেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার বিরুদ্ধ শক্তি হয়ে নির্ভয়েই সমাজে নিজেদের স্থান করে নিচ্ছে।
কিছু কিছু নৃশংসতাকে ঘৃণা করলেও কম করা হয়।
রক্তের দাগ কি কথা বলে?

(২৫)
প্যারিস রোড দিয়ে প্রভাত ফেরি ক’রে আমরা এসে থামি জোহা চাচার কবরে। রাজশাহী প্রশাসনিক ভবনের সামনে ঘন হ’য়ে গায়ে গায়ে লেগে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ দিয়ে ঘেরা জোহা চাচার মাজার। সুন্দর বাগান। যদিও এখন শুনি জোহা চাচার কবরের চেহারা নাকি বদলে গেছে। সেই গাছ আর নেই। পুরাতনের জন্য বুকের ভিতরটা মুচড়ে ওঠে।
১৯৬৯ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি হানাদার বাহিনীর গুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটের সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা। তিনিই  প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। তাঁর আত্মদানেই দেশের গণআন্দোলন গণঅভুত্থ্যানের রূপ নিয়েছিল। ড. জোহা হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে আইয়ুব সরকারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সব স্তরের মানুষ ফুঁসে উঠেছিলো। উনি বলেছিলেন একটা ছাত্রের বুকে গুলি চালানোর আগে আমার উপর গুলি চালাও।
জোহা চাচার মাজারে ফুল দিয়ে আমরা যাই সমাদ্দার কাকুর সমাধিতে ফুল দিতে। লাইব্রেরীর সামনে ডানপাশ ঘেঁষে সংস্কৃতের অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার কাকুর সমাধি। খোকন, খুকুমণি, শিউলির প্রিয় বাবা, চম্পামাসীর স্বামী এখানে শুয়ে আছেন। অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার মুক্ত চিন্তা আর ধর্ম নিরপেক্ষতাতে বিশ্বাস করতেন। একজন অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ ছিলেন তিনি।
কাকু মারা যাবার পর চম্পামাসী অনেক কষ্ট করেছেন ছেলে মেয়েদের মানুষ করতে। একেবারেই অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না। মাসী তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। কিন্তু আপ্যায়নে কোনদিন কমতি ছিল না। এখনো মনে আছে লক্ষীপূজা হলেই আমরা খুকুমণিদের বাসায় হাজির হতাম। খিচুড়ি, বেগুনভাজা, বাঁধাকপি, ফুলকপির তরকারি খেয়ে বাড়ি ফিরতাম। সাথে থাকত নারকেলের নাড়ু, পায়েস। গান হ’ত। সবাই মিলে আবার জীবনটা চালানোর চেষ্টা হ’ত।
এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে পাকিস্তানী সৈন্যরা এসে ইউনিভার্সিটির স্টাফ কোয়ার্টার থেকে সমাদ্দার কাকুকে ধরে নিয়ে যায়, তারপর নির্মমভাবে হত্যা ক’রে। সমাদ্দার কাকুকে হত্যা করবার পর ইউনিভার্সিটির রাজাকার শিক্ষক ওঁনার চশমা এনে বাড়ির দরজার কড়া নেড়ে চম্পা মাসীর হাতে দিয়ে গিয়েছিল। মানুষের ধৃষ্টতা তার হিংস্রতাকেও অতিক্রম করে যায়।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান নিখোঁজ হয়ে যান ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি। বড় ভাই বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি শহিদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়েছিলেন উনি। ৩রা ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সায়েন্স লেবরেটরি থেকে আমরা আমার বাবার মৃতদেহ পাই। ছোটবোন শ্যামার বয়স ছিল দেড়, আমার সাড়ে চার। মার সাতাশ। যেসব মানুষকে যুদ্ধ ছুঁয়ে গেছে তাদের মনে হয় ফুসফুসের মধ্যে একটা ছিদ্র হয়ে যায়। তারা আর কোনদিন অন্য মানুষদের মত করে নিঃশ্বাস নিতে পারে না।


(২৬)
শহীদ মিনারে আসলেই আমরা যেতাম শহীদ স্মৃতি সংগ্রহ শালায়। সাথে প্রাণ প্রিয় বন্ধু সুস্মি, শাওন। আজ সকালেই সুস্মি আমায় শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার নানা তথ্য দিল।
শহীদ মিনারের যে মুক্তমঞ্চ তার গ্রিনরুমেই প্রথম গড়ে উঠেছিল এই শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা।মুক্তমঞ্চের সামনের ৪০/১২ ফিট ম্যুরালটা
শিল্পী ফণীন্দ্রনাথ রায়ের করা। বিধস্ত গাছ। পাতা নেই। শকুনেরা চারপাশে। তারপর স্বাধীনতা এল। গাছে আবার ফুল, গাছে আবার পাতা। সাদা পায়রা উড়ছে। শান্তির কপোত। নাটক, আবৃতি, গান - কত অনুষ্ঠানই যে হ'ত এই মুক্তমঞ্চে।
খালি পায়ে আমরা সংগ্রহশালার ভিতরে ঘুরতে থাকি। সুস্মির চোখ ভর্তি জল। শাওন কোন কথা বলছে না। আমার গলার কাছে একটা শক্ত দলা মত আটকে আছে।
বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগ্রহশালা এই শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা । গড়ে উঠেছে স্বাধীনতা যুদ্ধে শিক্ষক, ছাত্র, কর্মচারীদের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে। চোখের সামনে শহীদ জোহা চাচার বিভিন্ন ছবি, হবিবুর রহমান চাচা, সমাদ্দার কাকু, কাইয়ুম চাচার ব্যবহৃত জিনিস, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন পোশাক, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আলোকচিত্র, নিহত শহীদ আসাদের কিছু দুর্লভ ছবি, বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা মুক্তিযুদ্ধের ছবি, রাজশাহীতে উত্তোলিত প্রথম জাতীয় পতাকা, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ব্যবহৃত চশমা, ঘড়ি, একাত্তরের গণহত্যায় নিহত অসংখ্য শহীদের মাথার খুলি আর হাড়। বেশির ভাগ খুলি আর হাড় উদ্ধার করা হয়েছে জোহা হলের পাশের গণকবর থেকে। 
বিস্ময়ে আমরা তাকিয়ে থাকতাম পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবির দিকে। পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী, ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার উপস্থিতিতে স্বাক্ষর করছে। অপলকে দাঁড়িয়ে দেখতাম বিজয়ী মুক্তিসেনাদের ছবি। গেঞ্জি, লুঙ্গি, কোমরে গামছা বাঁধা , পাজামা পড়া খুব সাধারণ চেহারার মানুষের হাতে রাইফেল। ওরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। নির্যাতন কতটা ভয়ঙ্কর হ'লে এরকম মানুষেরা একটা দেশ স্বাধীন করতে পারে!
ডিকশনারিতে পড়ছিলাম 'জেনোসাইড' মানে কি? কোন জাতির বিলোপসাধন, কোন সস্প্রদায়ের বিলোপসাধন, গণহত্যা, কোন জাতির পরিকল্পিত ধ্বংসসাধন হচ্ছে 'জেনোসাইড'। ছোট্ট একটা দেশ বাংলাদেশের জেনোসাইডে ১৯৭১ সালে ৩ মিলিয়ন লোক হত্যা করা হয়েছিল। ৩,০০০,০০০ মানুষ হত্যা ; ৪০০,০০০ ধর্ষণ , এর বিনিময়ে আমার দেশ।
পৃথিবীর অন্যান্য অসংখ্য 'জেনোসাইডের' মধ্যে কয়েকটা জেনোসাইডের কথাও পড়ছিলাম।
হলোকস্ট-এ ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত হত্যা করা হ'য় ১৭, ০০০,০০০ জন মানুষ।
কম্বোডিয়ার জেনোসাইডে ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে হত্যা ক'রা হয় ৩,০০০,০০০ জন মানুষ।
আর্র্মেনিয়ার জেনোসাইডে ১৯১৫ সাল থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে হত্যা ক'রা হয় ১,৫০০,০০০ জন মানুষ।
বসনিয়ার জেনোসাইডে ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে হত্যা ক'রা হয় ৩৯,১৯৯ জন মানুষ।
মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা দেখে হাত পা অবশ হ'যে যায়। কী অপরিসীম কষ্টের ভিতর, কী নৃশংসতার ভিতর মৃত্যু হয়েছে এইসব নিরীহ মানুষদের তা ভাবতে পারি না। যারা হত্যা করেছে সেইসব দানবদের উল্লাস দু'হাত দিয়ে কান চাপা দিয়েও শুনতে পাই। নরপিশাচ পৃথিবীর মাটিতেই হেঁটে বেড়ায়।
(২)
এক নদী রক্ত পেরিয়ে
বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা
তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না।
না না না শোধ হবে না।
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাত কোটি মানুষের
জীবনের সন্ধান আনলে যারা
সে দানের মহিমা কোন দিন ম্লান হবে না
না না না ম্লান হবে না।।
হয়ত বা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না
বড় বড় লোকেদের ভীড়ে
জ্ঞানী আর গুনীদের আসরে
তোমাদের কথা কেউ কবে না।
তবু হে বিজয়ী বীর মুক্তিসেনা
তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না।
না না না শোধ হবে না।।
থাক ওরা পড়ে থাক ইতিহাস নিয়ে
জীবনের দীনতা হীনতা নিয়ে।
তোমাদের কথা রবে সাধারণ মানুষের ভীড়ে
মাঠে মাঠে কিষাণের মুখে
ঘরে ঘরে কিষাণীর বুকে
স্মৃতি বেদনার আঁখি নীড়ে।
তবু হে বিজয়ী বীর মুক্তিসেনা
তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না।
না না না শোধ হবে না।।
গীতিকার ও সুরকার খান আতাউর রহমান । ‘আবার তোরা মানুষ হ’ । সামনের সারিতে বসে আছে যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধারা। ক্যামেরা একজন একজন ক’রে তাঁদের মুখের উপর দিয়ে সরে যাচ্ছে। কারো গলায় ফুলের মালা, কারো কোলের উপর ফুলের মালা ।  বঙ্গবাণী মহাবিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে গান হচ্ছে। ‘তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না।’ উইস্কনসিনে বসে এই এতদূরে প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসে এই গানটা আমি শুনি । বারবার। দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়ে। দুর্নীতি আর রাজনৈতিক ছলা-কলায় ব্যর্থ হয়ে গেছে শহীদের এত রক্ত। নিজেকে দোষারোপ করি। পড়ে আছি বিদেশ বিভুঁই –এ সেই আঠারো বছর বয়স  থেকে। আজকের বসবাসের অযোগ্য বাংলাদেশে প্রতিদিন বেঁচে থাকবার যুদ্ধটুকু পর্যন্ত  করিনি আমি।
ছেলেবেলায় প্রভাতফেরি সেরে ফিরবার পথে মনটা ভারি হ’য়ে থাকত। নানা কিছু চিন্তা করতাম। দশ বছর বয়সের নিষ্পাপ আর সব কিছুই করে ফেলা সম্ভব ধরণের মনটা নিয়ে ভাবতাম নিজের দেশটার জন্য কি করা যায়। ধীরে ধীরে দেশপ্রেমের থেকে উচ্চাকাংখাটা বড় হয়ে উঠল। নিজের কথা ভাবতে শিখলাম। এখন আমার চেনাশোনা বেশির ভাগ বন্ধুই বাংলাদেশে থাকে না। আমরা বিদেশে থাকি। শীতের পাখির মত ঠান্ডা পড়লে দেশে যাই। কিছুদিন ট্যাংড়া মাছ, বাঁশপাতা মাছ, কাজরী মাছ খেয়ে বিদেশে যার যার ঘরে ফিরে আসি। বিশ বছর, ত্রিশ বছর থাকবার পর নিজেদের বাংলাদেশি-আমেরিকান, বাংলাদেশি-ক্যানাডিয়ান হিসাবে ভাবতে শিখে যাই। রক্তের ভিতর শুধু একটা অস্বস্তি কাজ করে। বেঁচে থাকবার অস্বস্তি।
(২)
একবার একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা করেছিলাম ঘুম ভাঙার গাননাটক। দর্শন বিভাগের উতসাহী নাট্যকার সুখেন কাকুর লেখা ও নির্দেশনা। সুখেন কাকু হাসান আজিজুল হক চাচা, মমতাজ মাসী, মফিজ চাচা সকলের খুব প্রিয় পাত্র। সবাই দর্শন বিভাগের। আর হাসান আজিজুল হক চাচা এতবড় লেখক হলে কি হবে, আমাদের কাছে উনি ছিলেন হাসান চাচা। আমাদের নাটকে কিভাবে কি করতে হবে, আবৃতি করতে হলে কোন উচ্চারণটা কেমন হবে সব চাচার বলে দেওয়া চাই। আর আছেন নাজিম মাহমুদ চাচা। নাটক, আবৃতি সবকিছুতেই নাজিম মাহমুদ চাচার পথ নির্দেশনা। চাচার প্রতিষ্ঠিত আবৃতি সংগঠন স্বনন’-এ আমি, সুস্মি, পিয়া গুটিগুটি গিয়ে যোগ দিয়েছিলাম যদিও তা ছিল মূলতঃ ইউনিভার্সিটির ছাত্র, ছাত্রীদের সংগঠন। আমরা তখন নাইন, টেন এ পড়ি। রী আ আপার গলায় পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথন কিংবা রানা আপার কর্ণ কুন্তী সংবাদ অত ভালো আবৃতি বুঝি আর শুনি নি।তারপর আঠারো বছর হতেই সুস্মিটা রাশিয়া চলে গেল পড়তে, আমি ইন্ডিয়া। তবু যতো দূরেই যাই, আমরা সবাই স্বনন পরিবার।
আমাদের নাটক ঘুম ভাঙার গানহয়েছিল ১৯৭৮ সালে। টিয়াজ, লিসা, শুভ বালক বালিকা। হাসান চাচার মেয়ে সুমন ফুলপরীর মত দেখতে বলেই কিনা জানিনা হয়েছিল ফুলপরী। আমি পাতা কুড়ানী গরীব মেয়ে। ছেঁড়া শাড়ি পড়েছি ঠিকই কিন্তু মামস আর একশ চার ডিগ্রী জ্বর নাটকের দিন। ঠান্ডা বাঁচাতে পায়ে সাদা মোজা পড়েই গরীব মেয়ের ভূমিকা করে ফেললাম। আমারটা তো অভিনয়, সত্যি সত্যি তো আর পাতা কুড়ানি মেয়ে নই আমি, আমার জুতা আছে।
প্লেটো হয়েছিল হিং টিং ছটসন্ন্যাসী। বড় ভালো অভিনয় করেছিল প্লেটো। প্লেটো আমাদের মত ছিল, কিন্তু ছিল আমাদের থেকে আলাদা। খুব ছেলেবেলায় ওর মা মারা গিয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য আমার অনেক বন্ধুর ছেলেবেলায় বাবা ছিল না। দিদা বলত বাবা ছাড়াও হয়ত দিন চলে যায়। কিন্তু মা ছাড়া? জেবুন্নেসা চাচী চলে গিয়েছিলেন রোজার ঈদের দিন। আনন্দের দিন মানুষ চলে গেলে প্রতি বছর সেই দিনটা এলে বুকের ভিতরটায় যেন আরো বেশি করে বাজে। রাস্তায় কার কাছে কি শুনে কষ্ট পাবে ভেবে হবিবুর রহমান চাচী ছোট প্লেটোকে বাড়ি নিয়ে এসে খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ঘুমে স্বপ্নের ভিতর দুঃস্বপ্নের মত মা চলে গেল? নাজিম মাহমুদ চাচা তারপর থেকে মায়ের যত্নে রী আ আপা আর প্লেটোকে বড় করেছেন। আগে যে গ্রামের বাড়িতে থাকতাম, সেখানে গাছপালা বেশী ছিল। অনেক পাখি বাসা করত। মা পাখি, বাবা পাখি দুজনে মিলে বাচ্চাদের দেখাশোনা করত দেখেছি। কিন্তু মা পাখি না থাকলে একা বাবা পাখি বাচ্চাদের বড় করে উঠতে পারত না। নাজিম মাহমুদ চাচার অসীম স্নেহ দেখে মনটা ভিজে উঠত। স্বননের রিহারসাল দিতে প্লেটোদের বাসায় আমরা প্রায়ই যেতাম। দুটো দেয়াল এসে যেখানে মিশেছে সেখানে চাচীর প্রায় লাইফ সাইজ একটা পোর্টেট ছিল। অসম্ভব জীবন্ত পেইন্টিং। মনে হত চাচী বুঝি আমাদের দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন।
মৃত্যুর পর আমাদের স্কুলের মৌলবী স্যার জেবুন্নেসা চাচীর নামাজে জানাজা পড়তে রাজি হয় নি। চাচী নাটক করতেন, চাচী স্লিভলেস ব্লাউজ পড়তেন। পাপের শেষ নেই। ধর্ম জীবনের থেকে বড়? ধর্ম মৃত্যুর থেকে বড়? ধর্ম মানুষের থেকে বড়?
(২৯)
চুমকি সেদিন বলছিল, 'কি রে তোর পুতুল নাচের কথা মনে আছে? রাশিয়ান দল জুবেরী ভবনে এসেছিল?' হ্যাঁ, মনে নেই আবার? দলের নাম 'টিন টুকি'। কি মুগ্দ্ধ যে হয়েছিলাম। প্রায় আমাদের সমান সব পুতুল। ছেলেদের পরনে গ্যালিস দেওয়া প্যান্ট। প্লেইড শার্র্ট। লালচে চুল। মেয়েদের পরনে এপ্রন দেওয়া ফ্রক। মাথায় দু'টো বেনুনি। দড়ি ধরে টানলেই কুয়ো থেকে জল তুলছে। ফুলের গন্ধ শুঁকছে। হ্যান্ডশেক করছে। হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। বেঞ্চিতে বসে গল্প করছে। দড়ি ধরে না টানলে কিছুই ওরা করতে পারছে না।
বাড়িতে এসে আমরা খুব চেষ্টা করতাম পুতুল নাচ করবার। নিজেদের পুতুলগুলোর মাথায় দড়ি বেঁধে তারপর দড়ির মাথায় কাঠি দিয়ে ডানদিকে, বামদিকে নাড়াতাম। আমাদের পুতুল মাঝে মাঝে কথা শুনত। বেশিরভাগ সময়ই না। আমরা রাজনীতিবিদ ছিলাম না। আমরা অন্য কোন শাক্তিশালী দেশ ও ছিলাম না। নির্দোষ 'টিন টুকি' নয়, যে পুতুল নাচে বাংলাদেশ নাচছে আজ বানরের মত, দেশের যে নিরীহ মানুষগুলোকে পুতুল নাচ নাচাচ্ছে দেশের রাজনীতিবিদ আর বিদেশী শক্তি গুলো - তা ঘৃণার যোগ্য।
মানুষের দেশ নামের যে মা থাকে, আমার সে মা হারিয়ে গেছে।
(৩০)
হাউ মাউ খাও মানুষের গন্ধ পাও
হাউ মাউ খাও মানুষের গন্ধ পাও
রূপ দেখতে তরাস লাগে বলতে করে ভয়
কেমন করে রাক্ষসীরা মানুষ হয়ে রয়
চপ চপ চপ চিবিয়ে খেলে আপন পেটের ছেলে
লোহার ডিম সোনার ডিম কৃষাণ কোথায় পেলে
আমাদের নাটক নীল কমল লাল কমল। তপন হয়েছিল লালকমল, আমি নীলকমল। পিয়া আর শ্যামা বরাবরের মত সুন্দরী রাজকন্যা! নাটকের নির্দেশনায় মণিমা। মণিমা - মা, কুংকীমা, মণিমা (মা, মেজমাসী, ছোটমাসী) আমার এই তিন মায়ের এক মা। জুবেরী ভবন, নজরুল মিলায়তনে আমাদের অনুষ্ঠান তো হ'তই। কিন্তু যখন সেখানে না হচ্ছে, অনুষ্ঠান হ'ত আমাদের বাড়িতে। এক মাস ধরে নাটকের রিহারসাল। শুধু ফ্ল্যাটের সবাই দেখবে। কিন্তু তার জন্য কি পরিশ্রম। সেই তো। কেমন করে রাক্ষসীরা মানুষ হ'য়ে রয়?’
দিদার কাছে মণিমার অনেক গল্প শুনতাম। শুনতাম মা, কুংকীমা, কাজলমামা, বাপিমামারও ছেলেবেলার গল্প। দিদার বলা রামায়ণ, মহাভারতের গল্প ছাড়াও এইসব গল্প আমার খুব ভালো লাগত। জীবনের নকশিকাঁথায় ছোট ছোট ফোঁড় যেন। দিদাকে আমার বনের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক মহীরুহ বলে মনে হত। বনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সব ঝড়, সব চারাগাছগুলোর বড় হয়ে ওঠার গল্প, সব পাতাদের আলতো করে গায়ে পরশ বোলানোর কথা, সব সব সে জানে। দাদু, দিদা, ঠাকুমা, ঠাকুরদার জন্যই বুঝি একটি পরিবারের ধারাবাহিকতার গল্পগুলো হারিয়ে যায় না। ভালোবাসা গোলাপ ফুলের তোড়ায় ফোটে। জানিস না তো তোর মণিমার দুধ খাওয়ার কেচ্ছা। তোর দাদুর খুব প্রিয় ছিল তোদের মণিমা। ডাকত নিমো বলে। মণি উল্টালে নিমো। একদিন রাত প্রায় নটা বাজে। মণির তো ক্লাশ টেন পর্যন্তও দুধ-ভাত না খেলে চলত না।ভীষণ দাপাদাপি। দুধ চাই। শেষে তোর দাদু সেই অত রাতে কনডেন্সড মিল্ক কিনে আনল। তাতে জল মিশিয়ে তবে শান্তি। আর পুতুল খেলা? তখন নাইন টেনে পড়ে। তোর মার বিয়ে হয়ে গেছে। সবাই কি বলবে এত বড় মেয়ের পুতুল খেলা দেখে? তাই পাজামার ফিতায় লুকিয়ে লুকিয়ে পুতুল বেঁধে যেত তোর মার বাড়ি।
আমার সাতমাস বয়সে মা ইংল্যান্ড যাওয়ায় আমি ছিলাম মণিমা, কুংকীমা, দিদা, দাদুভাই, কাজলমামা, বাপিমামার কাছে। এই মণিমাই তখন পুতুলখেলা বন্ধ করে জ্যান্ত মানুষছানা নিয়ে মেতে উঠল। আমাকে বড় করেছে আমার মণিমাই। প্রতিদিন একটা করে জামা বানাত আমার। এত সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের সেই সব জামা, ছবি দেখে বিশ্বাস হয় না এগুলো বাড়িতে বানানো। চাইনীজ কাট চুল। মণিমার বানানো জামা পড়ে স্টুডিওতে ঢোলের উপর বসে আছি। প্রফেশনাল ছবি তোলা হচ্ছে। বহুদূরে মা, বাবার কাছে পাঠানো হবে। কত যত্নে আছে রমা!
তখন রংপুরে। আমার জন্ডিস হয়েছে। চার বছর মত বয়স। সব কিছু সিদ্ধ খেতে হবে। দাদুভাই বলে দিল যতদিন রমা সিদ্ধ খাবে বাড়ির সবাই সিদ্ধ খাবে। সেটাই রান্না। বাড়িতে দাদুভাই, দিদা, পরিতোষমামা, মণিমা তখন। মণিমা সবচেয়ে ছোট। কিন্তু কোন আবদার নেই। যতদিন আমি সুস্থ হইনি সবাই ঢেঁড়স সিদ্ধ খেয়ে ছিল!
এ কি এ কি কি করছেন?’ সীটে বসা ভদ্রলোকের ত্রাহি চীত্কার। মণিমা আর উপরতলার বেবীআপা, রীণাআপা গেছে সিনেমা দেখতে। দেরী হয়ে গেছে। সিনেমা শুরু হয়ে গেছে। সানগ্লাস খোলা হয় নি। ব্যাস কিছু না দেখতে পেয়ে সীট ভেবে কোলের উপরই বসে পড়েছে তিনজন।
বেবীআপা, রীণাআপা, মণিমার দৌড়াত্বি আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। তিনজনেরই লম্বা চুল । মাথার বেনী আমাদের দোতালার বারান্দার রেলিং-এ বেঁধে একতলার বাগানের ডালিম চুরি করত ওরা। বাকি দুজন ধরে থাকত। যদি বেণী ছিঁড়ে পড়ত?
আমাদের ঘরে দু'টো বিছানা। দাদুভাই দিদার বিয়ের বার্মা টিকের খাটটায় থাকি মা, শ্যামা, আমি। আঠারো বছর বয়সে খড়্গপুরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এ বিছানাতেই আমি শুয়েছি। পাশের বিছানায় মণিমা। বাড়িতে অনেক লোক। আমাদের আলাদা বিছানা বা ঘর দেওয়ার মত পরিস্থিতি ছিল না। কিন্তু ঠেলাঠেলি মনে হ'য় নি কোনদিন। আমার তো মনে হ'ত মা বুঝি পাখার নিচে সবসময় মুরগির ছানা নিয়ে ঘুরছে। একদিন ভোর রাতে হঠা ধুপুস শব্দ। কি ব্যাপার? মণিমা দু:স্বপ্ন দেখে মশারি টশারি পেঁচিয়ে সোজা মাটিতে। তখন ইউনিভার্সিটি তে পড়ে। আর ঘুমাব কি? বাকি রাত হাসতে হাসতেই গেল। আমাদের নৃশংসতা ...
মণিমাকে ভালোবাসত যেমন আমার সব বন্ধুরা, ভয় ও পেত। উপর তলায় থাকত কাকলিরা। কাকলি প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক ও বিদগধ পণ্ডিত ড.সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে। ভারী মিষ্টি। কিন্তু মণিমার তো কড়া নিয়ম। প্রতিদিন দুপুরবেলা ঘুমাতে হ'ত আমার আর শ্যামার। একদিন দুপুর দু'টা বাজে। ছোট্ট কাকলির তো খেলতে ইচ্ছা করছে। আমাদের বাসায় এসে কড়া নেড়েছে। পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে। মণিমা দরজা খুলতেই থতমত কাকলি আর কোন কথা খুঁজে না পেয়ে বলে বসল , 'মনিমাসি, আমি না ঘুরতে ঘুরতেই চলে এলাম। '
একদিন শুনি আমার বন্ধু সুস্মি, ইয়াসমিন আর দীনা বলছে তোদের বাসায় রবিবার সকাল দশটার দিকে যাব না। কি ব্যাপার? জানা গেল মণিমা নাকি তখন করলার রস ক'রে আমাদের খাওয়াচ্ছে। বন্ধুরা এলে তাদের ও খেতে হ'বে।
সারা ছেলেবেলা মণিমা আমাদের রুটিন বানিয়ে দিয়েছে । কখন অংক করবো কখন বাংলা ব্যাকরণ।
ঢাকায় থাকবার সময় ও দেখতাম প্রমার জন্য দরজায় রুটিন সাটানো। কিন্তু দুই বছরের প্রভার রুটিন কই ? মণিমা বানিয়ে দিল সকাল নয়টা থেকে কান্না, দশটা পনেরো থেকে হাসি, এগারোটায় আহ্লাদ, বারোটায় খাওয়া, একটায় ঘুম, বিকাল চারটায় নাচ, সাড়ে চারটায় গান আর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশে ‘যা খুশী তাই’।
ছেলেবেলার কথা ভাবলে মনে হ’য় বেবী আপা, রীণা আপা, মণিমার লম্বা খিচুড়ি রান্না করবার কথা। ঢলঢলে লম্বা মুশুরির ডালের খিচুড়ি, তাতে আস্ত আস্ত পিঁয়াজ দেওয়া। আমার পিঁয়াজ খেতে একদম ভালো লাগত না। কিন্তু মণিমাদের বক্তব্য ছিল আস্ত পিঁয়াজ না দিলে নাকি খিচুড়িই হয় না।
যখন নাইন, টেনে পড়ি আমি মহা পড়াশোনা করতাম। রাত তিনটা থেকে উঠে বসে যেতাম অংক করতে। ওটা নাকি ব্রাহ্ম-মুহুর্ত। যা করা যাবে তাই অব্যর্থ শক্তিশেলের মত বুকে এসে বিঁধবে। আর কোনদিন তা ভুল হবে না। আমার অঙ্ক তো চলছে। কিন্তু রাত তিনটায় মণিমার কি হল? দুটো ডিমের জল পোচ করে আমার সামনে হাজির। জল পোচ খেলে মাথা খুলবে।
খুব কড়া নজর মণিমার আমাদের পড়াশোনার উপর। সন্ধ্যার আজান দিলেই তড়িঘড়ি বাড়ি এসে হাত পা ধুয়ে পড়তে বসবে। অংকতে একশতে একশপাওয়া চাই। বাংলা আর ইংরেজী রচনা যেন আর কেউ তোমার মত লিখতে না পারে। ক্লাশের পড়া তো অনেক আগেই শেখা শেষ। এবার তবে পরের ক্লাশের বই পড়।অত্যাচারের এক শেষ। মা কিছু বলত না। ভাবখানা এমন যে মণির হাতে ছেড়ে দিয়েছি। রমা শ্যামাকে নিয়ে ও যেমন ভালো মনে করে করুক। আর মণিমা এতই ভালো করেছিল আমাদের সারাদিন এটা কর সেটা কর বলে ডাকাডাকি করে যে এখনো নিজের মেয়ে প্রমা, প্রভাকে ডাকবার সময় প্রতিবার ভুল করে রমা শ্যামা বলে ডাকে।
আর শুধু কি পড়াশোনা? আমি তখন নব্য কবি। স্কুলে পড়ি। কবিতা লিখলেই মণিমাকে দেখানো চাই। মণিমা ছন্দ ঠিক করে দেয়, মণিমা শব্দ বদলে দেয়।
ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় মণিমার চেম্বারে গিয়ে পড়তাম আমি। এখনও মনে আছে ওই বিশাল ইজি চেয়ারের কথা। মনে হয় দুটো মানুষ ঘুমাতে পাড়বে ওই চেয়ারে। আমি ভাবতাম বুঝি এগুলো ব্রিটিশ আমলের চেয়ার। আর মণিমা যে চেয়ারে বসত তার পিছনে হলুদ আর হাল্কা গোলাপি নকশা করা খুব বড় একটা তোয়ালে থাকত। মাঝে মাঝে তোয়ালেতে হেলান দিয়ে বসে আমিও জজসাহেব জজসাহেব ভাব করতাম।
খড়্গপুর থেকে পাশ করবার পর আমি মণিমার বাসায় থেকে দুই বছর ঢাকায় এটমিক এনার্জি কমিশনে চাকরি করেছি। মণিমা ভোর চারটায় উঠে নিজের অফিস যাওয়ার আগে আমার জন্য ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ বা মাংস রান্না করে তা হটপটে ভরে সাজিয়ে দিত। উপরে এক টুকরো লেবু। এখন আমি সকালবেলা আমার ছেলেমেয়েদের জন্য লাঞ্চ বানাই। হৈ খায় পিনাট বাটার জেলি স্যান্ডউইচ। পাউরুটিতে মূলতঃ পিনাট বাটার আর জেলি মাখাই। তাথৈ-এর জন্য গ্রীলড্ চীজ স্যান্ডউইচ। খুবই সোজা বানানো, তবু সকালে উঠে অফিস যাওয়ার আগে কিছু করতে হলেই আমি হাঁপিয়ে উঠি। আমি যখন মণিমার বাড়ি ছিলাম, বয়স ছিল তেইশ, চব্বিশ। তবু একদিনও মনে হয় নি মণিমার একটুও কষ্ট হচ্ছে আমার জন্য এতকিছু দিয়ে লাঞ্চ বানাতে। হৃত্পিন্ডটা পাশের বাড়িতে রেখে মনে হয় তখন আমি চলাফেরা করতাম। এখন ভাবলেও লজ্জা লাগে।
শুধু জজিয়তি করা নয়, মণিমার সবদিকে কড়া নজর। তবু মাঝে মাঝে বলতে শুনেছি, ‘বাবাও জজিয়তি করত, আর আমিও করছি।আসলেই তো। দাদুভাই অফিস যাওয়ার আগে দিদা গরম গরম ভাত রান্না করে দাদুভাই-এর সামনে ধরত। যেদিন কোন কঠিন রায় দিতে হবে বাড়ির সবাই চুপ। দাদুভাই-কে চিন্তা করবার সুযোগ দেওয়া চাই। আর মণিমা? ভোর চারটায় উঠে রান্না করে, বাড়ির কাজ করবার লোকজনের ঝগড়াঝাটি সামলে তারপর অফিস যায়। কে খোঁজ নিতে যাচ্ছে যে আজ আদালতে গিয়ে চারটা খুনের ফাঁসি দিতে হবে? মেয়েদের জজিয়তি আর ছেলেদের জজিয়তিতে আকাশ পাতাল তফাত্।
১৯৮১ সালে মণিমার বিয়ে হয়ে গেল স্বপনমেসোর সাথে। এবার আমি কিভাবে বাঁচব? সেই জন্মের পর থেকে প্রতিটা দিন মণিমা ছিল আমার পাশে পাশে। আমার মার থেকেও বেশি সময় কাটিয়েছি মণিমার কাছে। আমার মনে হয়েছিল, আর যেন বাতাস নেই। আমি বুঝি আর নিঃশ্বাস নিতে পারব না। জীবনে সেই প্রথম বুঝি চিরকালের স্বার্থপর আমি স্বার্থহীন হ’তে শিখেছিলাম। মণিমার রাজশাহী সিল্কের বেনারসী শাড়ীর লাল রঙে সোনালি সূতার কাজ ছিল।
(৩১)

স্বপন মেসো এবার মণিমাকে নিয়ে চলে  যাবেন।  খুবই শান্ত মানুষ মেসো। রবীন্দ্র সংগীত গান।  আমার তো এবার 'সিভিল' আচরণ ক'রা দরকার।  আমি তখন রেডক্রস, গার্ল গাইড করতাম। আসলে আকাশের নিচে যা কিছু বাচ্চাদের সংগঠন ছিল সব করতাম। সূর্যশিশু, কিশোর কুঁড়ি, খেলাঘররেডক্রস, গার্ল গাইড, পাতাকুড়ানি ছেলেমেয়েদের পড়ানোর  স্কুল  সব সব। আর সেই যে সিঁড়ি ঘরের নীচে বাড়িতে না জানিয়ে বাচ্চা বিড়াল পোষা! অথচ  আমার তাথৈ যখন আজ সফটবল, কয়্যার, ক্রস কান্ট্রি, স্টেজ ক্রু , অর্কেস্ট্রা সব ক'রে বেড়ায় আমি ভাবি এত উসাহ ও কোথা থেকে পেল? আর অসংখ্য বন্ধুপ্রেমে তাথৈ-এর মত আমাকেও বাড়িতে পাওয়া যেত না।  সারাদিন টো টো। 
রেড ক্রস-এ কিজন্য যেন আমাদের গিফট দিল।বিদেশী সব উপহার। ভারী সুন্দর টিফিন ক্যারিয়ার, নীল সাদা নরম তুলতুলে তোয়ালে। বিদেশী জিনিস আমাদের বেশি ছিল না বলেই কিনা জানি না তার উপর বড় লোভ ছিল।  লোভ ছিল মিসেস ক্লার্কসনের দেওয়া সাবানের উপর ও  ।  আমার টা সবুজ কৌটায়, শ্যামার টা কমলা। কৌটার উপর সোনালী এম্বস  ক'রা ফুল, লতা আঁকা ছিল। কি যে খুশবু ছিল সে সাবানে। জমিয়ে রাখতাম , শুধু  সকালবেলা  ঈদ  আর পূজাতে মেখে স্নান করতাম। প্রায় চুয়াল্লিশ  বছর পর এখনো বুঝি সেই সাবানের কৌটা আমার সিন্দুকে পাওয়া যাবে। নীল সাদা তোয়ালেও আমার তেমন প্রিয় হ'যে গেল।  নাড়ি চাড়ি, গালে একটু ছুঁইয়ে দেখি, তারপর ভাঁজ ক'রে রাখি।  মণিমাকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন ব'লে যে আমি একটুও কষ্ট পাচ্ছি না বোঝাতে সেই সবচেয়ে প্রিয় তোয়ালেটা আমি স্বপন মেসোকে দিয়ে দিলাম। 

কাজলমামা যাবে মণিমাদের সাথে বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় স্বপনমেসোর বাড়ি। শেষ মুহূর্তে আমিও আর সহ্য করতে না পেরে চেপে বসলাম ট্রেনে।  কি যে সুন্দর দুপচাঁচিয়া গ্রাম। 'ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়'।  বিরাট বড় একটা পুকুরের কথা আমার এখনো মনে পড়ে।  'কালো জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চক্ষু নিয়া'।  মনে পড়ে খড়ের গাদার কথা।  এই খড়ের গাদার চুড়ায় চেপে প্রমা, প্রভার ও ছবি আছে পরে। 

গ্রাম ভেঙে মানুষ বৌ দেখতে এল।  মেয়েরা গোপনে ফিস ফিস করে বললো  বৌ-এর গায়ের রং বেশ  কালো। মণিমার শাশুড়ি অসাধারণ মানুষ।  শাশুড়ি মানেই অসম্ভব কেউ যে নয়, তা আমি সেই বয়সেও ওঁনাকে দেখে বুঝতে পারলাম।  সেই দিদার নাম ও  ভারী সুন্দর।  পূর্র্ণশশী। বৌ-এর গায়ের রং কালো শুনে পূর্ণশশী দিদা চোখের  পলক না ফেলে মণিমাকে বললেন, 'মা, তোমার চুলগুলো একটু খুলে বস তো ' ।  মণিমার কোমর ছাড়িয়ে ঘন কালো চুল ছিল।  নতুন বৌ হ'য়েও মণিমার হাসি পেল।
এই গল্পটা আজ ও যখন ভাবি, আর বিভিন্ন শাশুড়িদের নানা হিংস্রতার গল্প শুনি, আমার চোখ  জলে ভরে যায়।  ভালোবাসা সহজাত, তা শিখবার কিছু নেই।
জুলাই মাসে বিয়ে হয়েছিল মণিমার।  বাংলার আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এ মাসে। ভেজা কদমফুলের গন্ধে আমার ভিতরটাও তোলপাড়। এমন অঝোর ধারায় বৃষ্টি এই পশ্চিম মুলুকে দেখি না।  সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পূর্র্ণশশী দিদা রান্না করছেন।   স্বপন মেসোর নাম ভানু। আর বড়দাদার নাম কানু।  কানু আর ভানু মা'কে ডাকল, 'মা আয়, একটা গান করে যা ' । দিদা সাথে সাথে হাতের হলুদ মুছে গান করতে এসে গেলেন। শেখেন নি কোথাও। শুধু শুনে শুনে গান। কি সুন্দর যে গলা। আঙুরবালার মত ।  পুরানো দিনের গায়কী।  স্বপন মেসো বুঝি মায়ের গানের গলা ই  পেয়েছেন।
বৃষ্টি ঝরেই চলেছে। বেশ রাত। গ্রামে রাতকে আরো যেন গভীর ব'লে মনে হয়। বেশি আলো নেই চারপাশে। সবশেষে গান গাওয়ার পালা মেসোর। মেসো গেয়ে উঠলেন,  
"হায় বরষা, এমন ফাগুন কেড়ে নিয়ো না
আমার প্রিয়ার চোখে জল এনো না
মধুর স্বপন ভেঙে দিয়ো না
বাদল হাওয়া যেন ঝড় তুলো না
আরো ধীরে ধীরে বও না
পাতার কানে কানে বৃষ্টিধারা
চুপি চুপি কথা কও না ।
অনেক চাওয়ার পরে যাকে পেলাম সেই যে আমার শেষ ভরসা "।
কাজলমামা পূর্র্ণ শশী দিদা আর দাদুকে দেখে মুগ্দ্ধ।  বৈষ্ণব মানুষ।  কারো সাতে পাঁচে নেই।  শুধু মানুষকে ভালোবেসে জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছেন।  কাজলমামা আমাকে বললো  এঁনাদের দেখে  তোমার ঠাকুরদা, ঠাকুরমার কথা মনে পড়ে।  একই রকম পূর্র্ণ  মানুষ। আমার তো নিজের ঠাকুরমা, ঠাকুরদার কথা মনে নেই। ছয় সাত মাস বয়সে ওঁনারা আমাকে শেষ দেখেছেন । কাজলমামার কথা শুনে মাথা  শ্রদ্ধায়  নত হ'য়ে গেল।
রাজশাহী ইউনিভার্সিটি তে 'শ্যামা' 'বে। অঙ্কের বিশিষ্ট, বিদগ্ধ শিক্ষক প্রফেসর সুব্রত মজুমদার কাকু নির্দেশনা দেবেন। আর বাড়িতে রিহারসালে আপ্যায়ন করবেন দীপিকা মাসী।  বেশিরভাগ রবীন্দ্র সংগীতের অনুষ্ঠানেই কাকু নির্দেশনা দেন।  কাকী, কাকুর গুণী মেয়ে আনন্দ। যেমন পড়াশোনায়, তেমন গানে , অনুবাদে , কবিতা লেখায় , মুক্তিযুদ্ধ চর্চা কেন্দ্রের
কাজে ।  আমি আনন্দের মত গুণী মেয়ে খুব কম দেখেছি। আর কি অসম্ভব বিনয়ী। একদম কাকুর মত।
তখন আনন্দ বেশ ছোট।  ওরা পূর্ব পাড়ায় আমার বন্ধু ইয়াসমিনদের পাশের বাসায় থাকে। কাকু ইয়াসমিন, প্যামেলা, আনন্দ, শ্যামা আর আমার জন্য গণিত বিভাগ থেকে একটা টেলিস্কোপ নিয়ে আসলেন।  এর আগে কোনদিন টেলিস্কোপ দেখি নি। অবাক বিস্ময়ে সে রাতে আমরা শনির বলয় দেখলাম , বৃহস্পতির চাঁদ দেখলাম। আকাশের  ভালোবাসা আমাদের চোখের তারায় ঝিলমিল ক'রে উঠল। সাত আট বছরের জীবন যেন মুগ্ধতায় ভরে গেল।
শ্যামা গীতিনাট্যে বজ্রসেন হয়েছিলেন  স্বপন মেসো। শ্যামা কবিতা মাসি, মণিমা  সখি।
মনে পড়ে অনেক অনেক বছর পর শ্যামা দেখে বেবী আপার চার পাঁচ বছরের মেয়ে ছোট্ট অমি  বলেছিল, ' শ্যামা প্রেমও পেল না  , ক্ষমাও পেল না। '
খুব ভালো হয়েছিল এই গীতিনাট্য।  এত বছর পর এখনো কানে বাজে মেসোর গলায়,
ক্ষমিতে পারিলাম না যে
ক্ষম হে মম দীনতা  পাপীজনশরণ প্রভু!
দিদার যখন খুব শরীর খারাপ, স্বপন মেসো বেড়াতে ইন্ডিয়া ছিলেন ।  আমায় বললেন তিন মেয়ের শ্বশুরবাড়ি ঘুরে আসব।  আমার শ্বশুরবাড়ি, শ্যামার শ্বশুরবাড়ি, প্রভার শ্বশুরবাড়ি। ব্যাকরণ মতে শুধু প্রভাই তাঁর নিজের মেয়ে। দিদা ভালো নেই জেনে সব বাতিল ক'রে তড়িঘড়ি ঢাকাতে ফিরে এলেন মেসো। তারপর দিদা তো চলে  গেল।

আগে মনিমারা কুংকিমাদের বাসার চারতলায় থাকত। মা, দিদা থাকত তিনতলায়। একতলা, দোতলা মিলিয়ে থাকত কুংকিমা। মণিমা কাঁকড়াইলে  কোয়ার্টার পাবার পর মণিমা, স্বপনমেসো, মা, দিদা চলে আসল কাঁকড়াইলের বাসায়।  স্ত্রী, স্ত্রীর মা, স্ত্রীর বড় বোন - এই নিয়ে গড়ে উঠল পরিবার। স্বপন মেসোর পরিবার। স্বপনমেসো আমায় বলেছিলেন এটাই একমাত্র সলুউশন। এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক।
 আমার খুব আশ্চর্য  লেগেছিল।  এ কেমন পরিবার? সমাজ বিজ্ঞান বই-এ এমন পরিবারের  সংগা নেই। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধবের মধ্যে যে সুডো মানুষগুলোর নাম সমাজ সংস্কারক হিসাবে, বিপ্লবী হিসাবে শোনা যায়, স্বপন মেসোর নাম কোনদিন তাদের মাঝে ছিল না।
(৩২)
অসম্ভব গরম পড়েছে। বেগুনি রঙের জারুল ফুল ফুটে আছে।  টিনের চালের স্কুল আর দ্বিতীয় কলাভবনের মাঝখানে সারি বেঁধে জারুল গাছের সারি।  ফুলগুলোর পাপড়ি নরম টিস্যু  পেপারের মত।  প্রচন্ড গরমে বছরে একবারই ফোটে জারুল ফুল।  কলিটা ফেটে হঠা'রে যেন পুটুস ক'রে ফুটে ওঠে ফুল। 
যখন গরম আর সহ্য করা যাচ্ছে না ঠিক তখন বৃষ্টি নামল।  টিনের চালে ঝম ঝম শব্দ। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ ভুলে যাওয়া স্বপ্নের মত মনে হয়। অন্ধকার  'যে গেছে  ক্লাসরুম।  আল মাহমুদ স্যার ফিজিক্স পড়াচ্ছেন। ল্যাবরেটরিতে ব্যাঙ কাটা শেখাচ্ছেন অনু স্যার। ভদ্র স্যার হয়ত অংক করাচ্ছেন। হেডস্যার বলছেন বাংলা রচনায় সব সময় কোটেশন দেওয়া চাই।
এই আমাদের স্কুল।  রাজশাহী ইউনিভার্সিটি এক্সপেরিমেন্টাল স্কুল।  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষামূলক শিক্ষায়তন। হ্যাঁ সত্যি, ইউনিভার্র্সিটির ভিতর এক এক্সপেরিমেন্ট হিসাবেই শুরু হয়েছিল এই স্কুল ইউনিভার্র্সিটির টিচারদের ছেলে মেয়েদের  জন্য।
শহরের অন্যান্য বিখ্যাত সরকারি স্কুল থেকে একটু আলাদা স্কুলটা  আলাদা পি.এন স্কুল, হেলেনাবাদ স্কুল কলেজিয়েট স্কুল, শিরোল স্কুল থেকে।  ম্যাট্রিক পরীক্ষায় কোন সাজেশন পাওয়া যায় না আমাদের স্কুলে।  কোন চ্যাপ্টার ইমপরট্যান্ট তা কোন স্যার বা আপা বলে দেন না।  বই এর এ মাথা থেকে শেষ পর্যন্ত  পড়তে হয়।  মাঝে মাঝে ইউনিভার্র্সিটির টিচার রা এসে ক্লাস নেন।  ইউনিভার্র্সিটির অসম্ভব প্রতিভাবান তরুণ শিক্ষক তরফদার চাচা এসে কেমিস্ট্রি পড়িয়ে যান।  আমরা শিখি কেমিস্ট্রি  শুধু মুখস্ত করবার জিনিস নয়।
কিছুদিন আগে আমাদের স্কুলের পঞ্চাশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হ'ল। তার পত্রিকায় বন্ধুপ্রতিম নাজ(নাজনীন সুলতানা) একটা অসাধারণ লেখা লিখেছে  তার কিছুটা তুলে না দিয়ে পারছি না।
“টিন শেড স্কুলের গাড়ি বারান্দা, আর প্রথম সারি ও দ্বিতীয় সারি রুমগুলোর মাঝে ছিল সামান্য ফাঁকা জায়গা। ক্লাশ শুরুর আগে বা টিফিনের সময় বন্ধুরা মিলে সেখানে নিয়মিত ' কুমির তোর জলে নেমেছি' খেলতাম।
আমরা যারা পূর্বপাড়া থেকে যেতাম তারা টিফিনের সময় ক্লাশ রুমে সবার টিফিন বক্স এক সাথে খুলে সবাই মিলেমিশে খেতাম। হাতে বানানো আটার রুটি, সাথে আলু ভাজা বা ডিম ভাজা, শুকনো মিষ্টি, ফল -এসবই ছিল আমাদের নিত্যদিনের খাবার। স্কুলের পাশে বিক্রি হত লোভনীয় তেঁতুলের আঁচার, বরফ। শুধু পানির বরফের দাম ছিল ১০ পয়সা, আর সামান্য দুধ দেওয়া, আগায় নারিকেলের কুঁচি বসানো আইসক্রিমের দাম ছিল ২৫ পয়সা। কখনও কখনো কাঁচা আম ক্লাশের দরজার ফাঁকে চাপ দিয়ে থ্যাতলানো অবস্থায় লবন ছিটিয়ে খেতাম।”
আমাদের 'কুমির তোর জলে নেমেছি' খেলায় কুমির জলে থাকত মানে থাকত বারান্দার নিচে মাঠে।  আর আমরা সব বারান্দায়।  তারপর কুমিরের এপাশ, ওপাশ দিয়ে কুমিরকে লোভ দেখিয়ে জলে নামতাম। আর ছড়া কাটতাম, ‘কুমির তোর জলে নেমেছি, কুমির তোর জলে নেমেছি।’ কুমির ছুঁয়ে দিলেই যাকে ছোঁবে সে তখন নতুন কুমির।
ছেলেবেলায়  এমন কত যে খেলা খেলতাম আমরা। আমার ছোটমাসীর মেয়ে প্রভার সাথে গল্প করছিলাম সেদিন এই খেলাগুলো নিয়ে। ও আমার থেকে অনেক ছোট। কিন্তু ওরাও হলিক্রস স্কুলে খেলত এসব খেলা। এতদিন পর খেলাগুলো ঠিকমত মনে নেই আমার। প্রভার কাছে শুনে আবার ফিরে এল ছেলেবেলা। যদিও বেশীর ভাগ খেলাতে সবাই আমাকে ‘মিল্ক রাইস’ করত। ‘দুধ ভাত।’ আমি কাউকে ছুঁয়ে দিলেও কিছু যায় আসে না, কেউ আমাকে ছুঁয়ে দিলেও কোন লাভ ক্ষতি নেই । চিরকালীন এলেবেলে । আসলে স্কুলের পড়াশোনাটা আমি করতে পারতাম, খেলাধূলা একেবারেই না। কিন্তু খুব ইচ্ছা ছিল কেউ আমায় দলে নিক, আমাকেও কেউ খেলোয়াড়ের সম্মান দিক । জীবনে সব ইচ্ছা কি পূরণ হয়? ‘মিল্ক রাইস’ আর ‘দুধ ভাত’ হয়েই কেটে গেছে আমার স্কুল জীবন।
মনে পড়ছে "এল ও এন ডি ও এন লন্ডন" খেলাটার কথা । লীডার উল্টোদিকে মুখ ক'রে দাঁড়িয়ে থাকত।  আমরা আড়াআড়ি লাইন ক'রে পিছনে।  লীডার বলত টানা সুরে, "এল ও এন ডি ও এন লন্ডন" সে কথার ফাঁকে আমরা এক পা এক পা ক’রে এগিয়ে যেতাম । তারপর লীডার ঘুরে দাঁড়ানোর আগে নড়াচড়া না ক’রে শান্ত হ’য়ে, স্থির হ’য়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হ'ত। লীডার ঘুরে যদি কাউকে নড়তে চড়তে দেখত সে আউট। আর যে এক পা এক পা ক’রে এগিয়ে লীডারকে ছুঁতে পারবে তখন সেই হবে নতুন লীডার ।
খেলতাম ‘টি টি টি তোমার কি রং চাই?’ ‘টি টি’ র বাংলা ক’রে ‘চাচা তোমার কি রঙ চাই?’ একজন চোর হ’ত। এ খেলায় দলে অনেক লোক থাকত । আমরা সবাই চোরকে ঘুরে ঘুরে সুর ক’রে বলতাম ‘টি টি টি তোমার কি রং চাই?’ ‘চাচা তোমার কি রঙ চাই?’ হাত পা নেড়ে ভেংচি কেটে নানা রকম নাচানাচি করতাম । তারপর চোর কোন একটা রঙ বললেই সেই রঙ খুঁজতে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিতাম আমরা। রং খুঁজে পাওয়ার আগে যদি কাউকে ছুঁয়ে দিত চোর তবে সে তখন হ’বে নতুন চোর  
স্কুলে নানা রঙ খুঁজে পেতে একটু মুশ্‌কিল হ’ত যদিও। আমরা স্কুল ড্রেস পড়ে থাকতাম, নানা রঙের পোশাকের সুযোগ নেইছোট ক্লাশে মেয়েদের নেভী ব্লু স্কার্ট, সাদা শার্ট। গলায় সাদা স্কার্ফ। ছোট ছেলেদের নেভী ব্লু হাফ প্যান্ট, সাদা শার্ট । বড় ছেলেদের নেভী ব্লু ফুল প্যান্ট, সাদা শার্ট । সাদা কেডস সকলেরসাদা চক দিয়ে ঘষে ঘষে সাদা রং করতাম তা। কালো চামড়ার জুতাও ছিল। কিন্তু পি টি ক্লাশের দিন কেডস পড়ে আসতে হ’ত। বড় ক্লাশের মেয়েদের নেভী ব্লু টিউনিক; সাদা শার্ট; সাদা সালোয়ার; সাদা স্কার্ফ ; সাদা বেল্ট; কড়কড়ে মাড় দেওয়া, ফোল্ড করে ইস্ত্রি ক’রা সাদা ওড়না । অবশ্য আমাদের টিফিন বক্স আর স্কুলের ব্যাগে রঙের অভাব ছিল না । স্কুলের স্যার আপাদেরও তো আর স্কুল ড্রেস ছিল না। কিন্তু ‘টি টি টি তোমার কি রং চাই’ বলে ওঁনাদের ছোঁবার সাহস আমাদের কোনদিন হ’ত না।
আমাদের গলার সাদা স্কার্ফ খুব কাজে আসত রুমাল চুরি খেলা আর কানা মাছি ভোঁ ভোঁ খেলা খেলবার সময়ও
রুমাল চুরি খেলায় সবাই গোল হ’য়ে চোখ বন্ধ ক’রে বসতাম । একজন চোর হ’তকোন একটা জনপ্রিয় গান করতে থাকতাম । গান চলবার সময়ে চোর রুমাল অর্থা গলার স্কার্ফটা বসে থাকা কারো পিছনে খুব সন্তর্পণে রেখে দিত। যদি সে সাথে সাথে বুঝতে পারত তার পিছনে রুমাল রাখা হয়েছে, তবে উঠে চোরকে ধরতে পারলে সে তখন নতুন চোর হ’ত আর চোর তার জায়গায় বসে পড়ততা না হ’লে গান শেষ হ’লে, ঘুরে ঘুরে চোর এসে যার পিছনে রুমাল আছে তার পিঠে টোকা দিত। সে তখন উঠে চোরের পিছনে দৌঁড় দৌঁড়। চোরকে ছুঁতে হবে। আর চোরও দৌঁড়াচ্ছে তার খালি জায়গা টা নেওয়ার জন্য। চোরকে ছুঁতে না পারলে সেই তখন হ’বে নতুন চোর।

গলার স্কার্ফ কাজে আসত ‘কানামাছি’ খেলাতেও । সবাই গোল হ’য়ে দাঁড়াতাম। মাঝখানে একজন চোখে স্কার্ফ বেঁধে। সেই হচ্ছে ‘কানামাছি’ আমরা আমাদের গোলটার পরিধি আস্তে আস্তে বড় করতে থাকতাম । ‘কানামাছি’ আমাদের ছোঁওয়ার চেষ্টা করত । আর আমরা সুর ক’রে ক’রে ছড়া বলতাম, ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ যাকে পাবি তাকে ছোঁ।’ আর কানামাছির গায়ে টোকা দিতাম । যদি ‘কানামাছি’ চোখ বাঁধা অবস্থায় কাউকে ছুঁয়ে তার ঠিক ঠিক নাম বলতে পারত তবে সে হ’ত নতুন কানামাছি।
আমাদের খুব প্রিয় খেলা ছিল ওপেনটি বায়োস্কোপদুই দলের রাজা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দু’ হাত উঁচু ক’রে ধনুকের মত করত। তার ভিতর দিয়ে আমরা সবাই কাঁধে হাত দিয়ে লম্বা লাইন ক’রে ঘুরে ঘুরে যেতাম । সেই সাথে সুর তুলে গান করতাম
“ওপেনটি বায়োস্কোপ
নাইন টেন টেইস্কোপ
সুলতানা বিবিয়ানা
সাহেব বাবুর বৈঠক খানা
সাহেব বলেছে যেতে
পান সুপারি খেতে
পানের আগায় মরিচ বাটা
ইস-স্প্রিঙের চাবি আঁটা
যার নাম রেনু বালা গলায় দিলাম মুক্তার মালা।”
গলায় দিলাম মুক্তার মালা ব’লে যে সে মুহুর্তে ধনুকের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল তাকে ধরে ফেলা হ’ত। রাজারা তাকে জিজ্ঞাসা করত সে কোন দলে যাবে। এইভাবে সবাই একে একে ধনুকে ধরা পড়ে নিজেদের দল ঠিক ক’রে নিত। তারপর আসল মজা। দুইদলে দড়ি টানাটানির মত টানাটানি খেলা হ’ত। দড়ি ছাড়াই। কোন দল জিতল?
এখনো মাঝে মাঝে স্বপ্নের ভিতর ফুল টোক্কা খেলাটার কথা মনে পড়ে। কে যেন বলছে, ‘আয় রে আমার টগর’ ‘আয়রে আমার বেলী’। সন্ধ্যা হ’য়ে আসছে। আজান এই বুঝি দিল। তবু ‘আয় রে আমার টগর’।
ফুল টোক্কা খেলাটা দাবা খেলায় বোড়ের এগিয়ে যাওয়ার মত। দু’ দলে খেলা হ’বে। দু’ দলে দু’টো রাজা থাকবে । প্রত্যেক রাজা তার দলের সবার এক একটা ক’রে ফুলের নাম দেবে। দল দু’টো মুখোমুখি লম্বা লাইনে বসবে । এক দলের রাজা অন্য দলের কাছে গিয়ে একজনের চোখ দু’হাত দিয়ে ঢেকে নিজ দল থেকে ডাকবে, ‘আয় রে আমার টগর’ কিংবা ‘আয়রে আমার বেলী’। তখন টগর বা বেলী এসে কপালে টোকা দিয়ে যাবে। রাজা যখন চোখ খুলে দেবে, তখন বলতে হবে কাকে ডেকেছিল । ঠিক বলতে পারলে এক লাফে যতদূর এগোতে পারে
যাবে । ঠিক বলতে না পারলে যে টোকা দিতে এসেছিল সে লাফ দিয়ে অন্য দলের দিকে যতদূর যেতে পারে যাবে। এভাবে যে দল আগে অন্যদলকে পার করে যেতে পারবে সেই দল জিতবে ।
ইঁদুর, বিড়াল খেলায় একজন ইঁদুর হ’বে, একজন বিড়াল হ’বে। বাকি সবাই হাতে  হাত ধরে ধরে গোল হ’য়ে দাঁড়াবে। সবাই ইঁদুরের পক্ষে। ইঁদুর ভিতরে থাকবে, বিড়াল বাইরে। বিড়াল হাতের ভিতর দিয়ে হোক যেভাবে হোক ভিতরে ঢুকে ইঁদুর ধরবার চেষ্টা করবে। সবাই বাঁধা দেবে। ইঁদুর ধরা যাবে না । ইঁদুরকে বাঁচানো চাই।

আরো কত খেলা। ইচিং বিচিং চিচিং চা, প্রজাপতি উড়ে যাদু’জন মাটিতে পা ছড়িয়ে বসত পায়ের পাতায় পায়ের পাতা লাগিয়ে। অন্য দু’জন ইচিং বিচিং চিচিং চা, প্রজাপতি উড়ে যা বলে ঘুরে ঘুরে লাফ দিত সে দুই পা’র ফাঁকে।

দড়ি টানাটানি খেলা আমরা এমনি খেলতাম না। কিন্তু সবসময় দড়ি টানাটানি খেলা থাকত স্কুলের স্পোর্টস ডে তে। আহা স্পোর্টস ডে! লাল নীল কাগজে তিন কোণা ফ্ল্যাগ বানিয়ে ময়দা দিয়ে আঠা করে সেই ফ্ল্যাগ চিটানো হত দড়িতে তারপর সেই ফ্ল্যাগওয়ালা দড়ির মালা চারদিকে ঝোলানো হ দড়ি টানাটানিতে ক্লাশ নাইনের উল্টোদিকে ক্লাশ টেন বা স্যারদের বিপরীতে আপারা। দড়ির মাঝখানে একটা রুমাল বাঁধা থাকত। তার দু’পাশে দু’দল। যে দল টেনে অন্য দলের সবাইকে নিজেদের দিকে নিয়ে আসতে পারবে সে দলের জিত। আপারা জিততে পারল না স্যাররা জিততে পারল তা নিয়ে ভীষণ হুল্লোড় পড়ে যেত আমাদের মধ্যে
যখন এসব দেশজ খেলা খেলতাম না, আমরা খেলতাম স্কুলের মাঠে ব্যাডমিন্টন যদিও আমি ব্যাডমিন্টন পর্যন্ত খেলতে পারতাম না। মনে মনে যদিও সবসময় ভাবতাম খেলাতেও আমি ট্রফি পাব । আসলে স্কুলে মনে হ’য় শুধু দাবা খেলায় আমি পুরস্কার পেয়েছিলামতাও দাবার পুরস্কার স্পোর্টস ডে তে মনে হ’য় দেয় নি । কালচারাল অনুষ্ঠানের বিতর্ক প্রতিযোগিতা , আবৃতি এইসবের সাথে দিয়েছিল। অথচ স্পোর্টসের মাঠে সকলের সামনে দিয়ে গর্বভরে হেঁটে গিয়ে পুরস্কার নেওয়ার কত যে লোভ ছিল আমার! আর সেই ভিক্টরি স্ট্যান্ড! আহা!
সময়ের অভাবে যে সব  খেলা আমরা স্কুলে খেলতে  পারতাম  না  তা  খেলতাম  বাড়ি  গিয়ে  বাড়ির সামনের মাঠে খেলতাম দাঁড়িয়া বাঁধা, নুনা বদন, বৌচি, টিপু, মোরগ লড়াই, গোল্লাছুট, টিলো এক্সপ্রেস, হা ডু ডুসিঁড়িঘরে লুকোচুরি।লিসাদের বাড়ির সামনের পার্কে গাছ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঝাঁই ঝাপ্পা কানাই মাছি। বারান্দায় খেলতাম কিত্  কিত্, এক্কা দোক্কা ছেলেরা খেলত গুলি, লাট্টূ, উড়াত ঘুড়ি বন্ধুদের সাথে ধাক্কাধাক্কি ক’রে খেলে হাঁটুর আর কনুই-এর চলটা উঠিয়ে ফেলেছিলাম আমরা। আমাদের ভিডিও গেম ছিল না ।

এখনো খুব মনে পড়ে টিপু খেলার কথা। দুই দল হ দল দুটো নিজেদের মধ্যে কয়েক গজ দূরে দাঁড়াত মাঝখানে পিরামিডের মত করে সাতটা, নয়টা বা এগারোটা পাথর সাজিয়ে রাখা হ প্রথম দলের থেকে একজন একটা বল দিয়ে পিরামিডের দিকে ছুঁড়ে মারত যদি পিরামিডটি ভাংতে পারে তিনবার সুযোগ দেওয়া হ যদি সে পিরামিড ভাংতে না পারে তখন দ্বিতীয় দল চেষ্টা করত আর যদি প্রথমদলের জন পিরামিড ভাংতে পারল কিন্তু দ্বিতীয় দলের কেউ বল মাটি ছোঁওয়ার আগে তা ধরে ফেলল, তবে দ্বিতীয় দলের টার্ন এসে যেত তারা তখন পিরামিডে বল ছুঁড়বে আর যদি দ্বিতীয় দলের কেউ বল্ টা ধরতে না পারে, তবে তাদের কাজ হবে প্রথম দল যেন আবার পিরামিড বানাতে না পারে তা দেখা দ্বিতীয় দল বল ছুঁড়ে ছুঁড়ে প্রথম দলের কাউকে ছুঁতে পারলে তারা হেরে যাবে আর যদি প্রথম দলের কাউকে বল ছুঁতে না পারে আর তারা পিরামিড সাজাতে পারে তবে তাদের আবার টার্ন হবে পিরামিডে বল ছোঁড়ার আর তা না হলে দ্বিতীয় দলের টার্ন এসে যাবে পিরামিড সাজিয়ে আমরা তারস্বরে সুর করে বলে উঠতামটিপু

আর সেই যে মোরগ লড়াই? ডান হাত পিছনে নিয়ে গিয়ে বাম পায়ের গোঁড়ালি ধরতে বে তারপর পিঠের পিছন দিক দিয়ে বাম হাত নিয়ে গিয়ে ডান হাত ধরতে হ’বে। তারপর অন্য দের পাশে ঘুরে ঘুরে একজন আর একজনকে ধাক্কা দিতে হবে। ধাক্কা খেয়ে যার হাত বা পা আর মোরগের ভঙ্গীতে থাকবে না, সে আউট। শেষ পর্যন্ত যে মোরগের মত থাকতে পারবে সেই জিতবে।

কাচের মার্বেল দিয়ে গুলি খেলা ছেলেরাই বেশি খেলত আর আমি অবাক য়ে  মার্বেলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম মসৃণ কাচের মার্বেল নীল, সবুজ, সাদা বা লাল রঙের ভিতরে সাদা, হলুদ , নীল বাবল মত আমি খালি ভাবতাম কিভাবে ওই সাদা, হলুদ , নীল রং মার্বেলের ভিতরে গেল
মাটিতে পায়ের গোড়ালি দিয়ে একটা ছোট গর্ত করা নীচু য়ে বসে আঙ্গুল ধনুকের মত রে মার্বেল ছুঁড়ে দিতে গর্তে নিজের গুলি দিয়ে গর্ত থেকে অন্যদের গুলি সরাতে আর যে প্রথম নিজের সব গুলি ওই গর্তের ভিতর ছুঁড়তে পারত সে জিতে যেত আর সব গুলি পেত

ছেলেরা ছাদে উঠে লাল, নীল ঘুড়ি দিয়ে আকাশটা ছেয়ে ফেলত। আমার বড় লোভ হ’ত। কিন্তু মেয়েরা ঘুড়ি উড়ায় না। আমি পাশে দাঁড়িয়ে দেখতাম ওরা কাচের গুঁড়ো ক’রে তা দিয়ে মাঞ্জা বানাচ্ছে। সূতায় লাগিয়ে তা দিয়ে অন্যের ঘুড়ি কাটাকাটি করছে। দিদা সবসময় বলত ছাদের কার্নিশের কাছে যাবি না। আকাশে চোখ রেখে কার্নিশ টপকে মাটিতে পড়ে যাবি। বয়স্কদের কথা না শুনে কতবারই আমরা জীবনের কার্নিশ টপকে পড়েছি, আকাশে উড়ে গেছে নানা রঙ্গের ঘুড়ি।

(৩৪)
নাজের লেখা থেকে টিফিনের আলুভাজার কথা মনে হল। একজন বলেছিল প্রত্যেক বাসার আলুভাজা আলাদা আলাদা। কথাটা সত্যি। শুধু গোঁফনয়, আলুভাজা দিয়েও মানুষকে যায় চেনা। ভোরবেলা আয়েশা বুবু এসে আমাদের বাসায় আলুভাজা আর সিদ্ধ আটার নরম তুলতুলে রুটি বানাত। আলুভাজার গায়ে ডিম ছিটানো থাকত। অমন আলুভাজা আর খাই নি। আমি অনেক বানাতে চেষ্টা করেছি। হয় নি। আমারটায় খুব বড় বড় ডিমের টুকরো হয়ে যায়। আয়েশা বুবুর মত শুধু ডিমের ছিটা ছিটা নয়। সিদ্ধ আটার রুটি ম্যাজিক রুটি। দুপুর পর্যন্ত শক্ত হত না।
আমাদের বাসার মহা কড়া স্বাস্থ্যরক্ষা আইনের জন্য আমার বা ছোটবোন শ্যামার কোনদিন স্কুলের সামনের আইসক্রিম বা তেঁতুলের আচার কিনে খাওয়া হয় নি। জুলজুল চোখে শুধু তাকিয়ে থেকেছি । জারুল গাছগুলোর নিচে লাইন করে ছেলে মেয়েরা আচার কিনত, আইসক্রিম কিনত। কে বলেছে মেয়েরা নাকি শুধু তেঁতুলের আচার খায়? আমাদের ক্লাশের মহা ভালো ছাত্র মেহেদী দেখিয়ে দেখিয়ে চেটে চেটে তেঁতুলের আচার খেত ।
মাঝে মাঝে টিফিনের সময় আমি আর শ্যামা হেঁটে বাড়ি আসতাম । খুব কাছে ছিল বাড়ি। বড় পুকুরটার পাশ দিয়ে স্কুলের বড় মাঠ টা পার করে একটা ছোট সাঁকো। তারপর বড় রাস্তা । পার হলেই সারি দিয়ে কাঁকনদের বাড়ি, দীনা মুনাদের বাড়ি, কাদের চাচীর বাড়ি, বুলাচাচীর বাড়ি। বাড়ি এসে মাঝে মাঝে দিদার রান্না করা মোচার ঘন্ট দিয়েও ভাত খেয়েছি । স্বর্গসুখ আর কাকে বলে? পূর্বপাড়া থেকে যারা আসত তারা এমন বাড়ি যেতে পারত না।
স্কুলের মাঠের পাশে থাকত দুটো মুদিখানার দোকান। তপন বলল একটা দোকান ছিল ওয়াজিউল্লার। সেখানে ভাবি চাটনি, টিকটিকির ডিম মানে ছোট ছোট গোল গোল লজেন্স, কদমা পাওয়া যেত। থাকত গোলাপি কাগজে মোড়া গ্ল্যাক্সো বিস্কুটের প্যাকেট । মোসাওয়ার খবর দিল গোলাপি প্যাকেটের গায়ে আংগুরের ছবি আঁকা ছিল। হ্যাঁ, সাদা ট্রান্সপারেন্ট রঙ এ। আমাদের বাড়িতে লোক এলে চা-এর সাথে দেওয়ার মত খুব কিছু খাবার থাকত না। সুস্মিদের বাড়ি তো নয়! হোস্নেয়ারা মাসীর বানানো ডিমের হালুয়া কিংবা শাহী টুকরা নেই । কটকটে টোস্ট বিস্কুটের উপর মার বানানো পেয়ারার জেলি মাখিয়ে দেওয়া হত। তা আবার বাচ্চারা এলে চেটে বিস্কুট বাদ দিয়ে জেলিটাই খেয়ে ফেলত। থাকত কালো জিরা আর পিঁয়াজ ভেজে মুড়ি। আর একটু উচ্চ মানের গেস্ট এলে আমাদের হাতে পাঁচটা টাকা দিয়ে দৌড়ে স্কুলের মাঠের ওই মুদিখানার দোকানে গ্ল্যাক্সো বিস্কুট আনতে বলা হত। খুব স্পেশাল ছিল এই গ্ল্যাক্সো বিস্কুট। লোক চলে গেলে আমরা একটা দুটো পেতাম । আজও গ্ল্যাক্সো বিস্কুটের স্বাদ আমার জিভে লেগে আছে।
আজকাল ওই সহজ জীবনের সরলতাটুকু জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। কাউন্টার টপের উপর তিরামিসু পড়ে থাকে। আমি ঘুরেও দেখি না।


(৩৫)


“ঢোল কীর্তন ভাসান জারি
গাজীর গীত আর কালো সারি
বাংলাদেশের বয়াতিরা নাইচ্যা নাইচ্যা এমনে গায়।”
আমার উৎসাহের শেষ নেই। ভদ্র স্যারের কাছ থেকে জারিগান শিখে তাতেও নাম দিয়ে দিলাম। পরনে লুঙ্গি, কোমরে আর মাথায় লাল, সাদা ডুরেকাটা গামছা বাঁধা। জারিগানের জন্য তৈরী বয়াতি। আসলে স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সবকিছুতেই নাম দিতাম অসীম সাহসী আমি । বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, আবৃতি, অবাস্তব গল্প বলা... খালি রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল গীতি, দেশাত্ববোধক গানে নাম দিতাম না লিসার ভয়ে। লাইসা আহমেদ লিসা! এদিকে গান আসলে আমি গাইতে পারতাম না। তাতে কি?
মনে আছে একবার রোকেয়া হলের পিছনের পুকুরটার পাশ দিয়ে হাঁটছি। বিরাট পুকুর। একপাশে শাপলা ফুটে আছে। সাদার ভিতর হালকা হলুদের আভা। কিছু পাতাকুড়ানি ছেলে মেয়ে তা দিয়ে মালা বানিয়ে গলায় পড়ে চলেছে। ফুলটা লকেট। কেউ কেউ মাছ ধরছে। পুকুরের কিনারায় শ্যাওলা জমে আছে। পুকুরের জলে একটা অদ্ভুত ভেজা মাটির গন্ধ । সেই গন্ধ নাকে এসে লাগছে। সাথে আমার খুব প্রিয় বন্ধুর ছোট ভাই। আমি গান শুরু করেছি খুব আবেগ দিয়ে, 'যে সুর গোপন গুহা হতে ছুটে আসে আকুল স্রোতে, কান্নাসাগর-পানে যে যায় বুকের পাথর ঠেলে.....’ । ভাইটি বলল, 'থাক না রমাদি। সুর তো ঠিক লাগছে না। ' ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। আজকাল আমি কোন লোকজনের সামনে তারস্বরে তাই গান গাই না। যতই কুচকাওয়াজ ক'রা বীর বিক্রম হইনা কেন । যখন গাড়ি চালাই তখন শুধু একা একা গান ক’রি। আমার মেশিনগান। খুব ভিড়ের রাস্তা দিয়ে যেতে নিয়ে মাঝে মাঝে নাকে অদ্ভুত মিষ্টি পাউডারের গন্ধ এসে লাগে। মনে করতে পারি না কোথায় এ গন্ধ পেয়েছিলাম। মানুষটাকে চিনি না। শুধু ভুলে যাওয়া স্মৃতিটুকু। তুলতুলে ভালোবাসার স্মৃতি। অচেনা মানুষের মত অচেনা ভালোবাসা পথ আগলে ধরে। অনেক হাতড়েও বহু গানের কথা মনে করতে পারি না।
ইংরেজী কবিতা আবৃতিতে নাম দিতাম আমি।
‘Half a league, half a league,
Half a league onward,
All in the valley of Death
Rode the six hundred.’
কিংবা
‘O Captain! my Captain! our fearful trip is done,
The ship has weather’d every rack, the prize we sought is won,
The port is near, the bells I hear, the people all exulting,
While follow eyes the steady keel, the vessel grim and daring;
But O heart! heart! heart!
O the bleeding drops of red,
Where on the deck my Captain lies,
Fallen cold and dead.’
ইংরেজী উচ্চারণ ঠিক হ’বে না ব’লে যেতাম প্রাণের বন্ধু ইয়াসমিনের মা জোন মাসির কাছে। ইংল্যান্ডের লেক ডিস্ট্রিক্ট-এর মানুষ মাসি। হাসিব মেসোকে ভালোবেসে বাংলাদেশেই থাকেন ।
রাজশাহী ইউনিভার্সিটির ইংরেজী ডিপার্মেন্টে ইংরেজি পড়াতেন মাসি। আমাদের স্পোকেন ইংলিশ ক্লাশ নিতেন। খেলার ছলে বাড়িতেই ইংরেজী নাটকের অভিনয় করত ইয়াসমিন, প্যামেলা । মাসির কাছে শিখে।
ওদের সিন্ডি পুতুল ছিল। তাদের হাঁটুতে ভাজ ক’রে বসানো যেত। আমার কি লোভ যে হ’ত। মনে আছে আমি একবার করড্ররয় কাপড় দিয়ে পুতুলগুলোর স্কার্ট আর জ্যাকেট বানিয়েছিলাম। তাতে ট্যাক পিন দিয়ে বোতাম করেছিলাম।
আমি এত সাজানো, সুন্দর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাড়ি ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে আর দেখি নি। বসবার ঘরে ধবধবে সাদা একটু পুরু কাপড়ের টেবল ক্লথ। তাতে লেজি ডেজি ফুল তোলা হাল্কা নীল, গোলাপি, হলুদে। মাসী করেছেন। মাড় দিয়ে ইস্ত্রি ক’রা । মাসির মত অসাধারণ কেক কেউ বানাতে পারত না। ইয়াসমিন প্যামেলার অপূর্ব সুন্দর সব জামা মাসি মেশিন ছাড়া হাতেই সেলাই করতেন । সব সময় শাড়ী পড়তেন । মাথায় অপূর্ব এক পরিপাটি খোপা।
আমি ইয়াসমিনদের বাড়ির আগে ক্রীসমাস ট্রী দেখিনি কখনো । কিন্তু রাজশাহীতে ফারগাছ কই? একটা লিচুগাছের ডাল দিয়ে ক্রীসমাস ট্রী সাজানো হ’ত ওদের বাড়ি। তাতে ঝুলত মাসীর একটা সোনালি রঙ্গের বলের মত অর্নামেন্ট। আগে কোনদিন অর্নামেন্টও দেখিনি। কি ভালোই যে লাগত আমার । বড় হ’য়ে যখন পাবলো নেরুদার মেমোয়ার পড়ি, বনের ভিতর সেই তিন ফ্রেঞ্চ বোনের কথা পড়তে গিয়ে জোন মাসির কথা মনে হ’ত । নিজ দেশ থেকে বহুদূরে কিভাবে নিজের দেশের ঐতিহ্যটুকু ধরে রেখেছিল তিন বোন! কি আতিথেয়তা আর ফ্রেঞ্চ রান্না!
মানুষের ঔত্‌সুক্য কিন্তু কম ছিল না জোনমাসিকে নিয়ে। আমাদের স্কুলের কিছু আপাই তো। ইয়াসমিনকে ডেকে জিজ্ঞাসা, ‘তোমরা খ্রীষ্টান না মুসলমান?’ কোন মানুষকে এ ধরণের প্রশ্ন করাটা যে অশ্লীল তা কে কাকে শেখাবে? তাও আবার স্কুলের শিক্ষিকাকে!
ইয়াসমিনরা হাসিব মেসো হঠাত ক’রে মারা যাওয়ার কিছুদিন পর ইংল্যাণ্ড চলে গিয়েছিল । আজো মনে পড়ে সেইদিনটা ৮ই মে ছিল । আমার বুকের ভিতর তোলপাড়। এর আগে কোনদিন বন্ধু হারিয়ে ফেলি নি । ইয়াসমিন খুব বিভুতিভূষণ ভালোবাসত। আমায় যাবার আগে একটা ক্যাসেট ভরে অপুর কথা টেপ করে দিয়ে গেল ও। টানা টানা কাঁপা কাঁপা স্বর ইয়াসমিনের। আমি বারবার রিওয়াইন্ড ক’রে ক’রে তারপর রাত দিন শুনতে থাকলাম, ‘মাঝেরপাড়া স্টেশনের ডিস্‌ট্যান্ট সিগন্যালখানা দেখিতে দেখিতে কতদূরে অস্পষ্ট হইতে হইতে শেষে মিলাইয়া গেল...’


(৩৬)

ক্লাশ ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার জন্য স্পেশাল ক্লাশ নিতেন গাফ্‌ফার স্যার । আর ক্লাশ এইটের বৃত্তি পরীক্ষার জন্য ক্লাশ নিতেন মাহবুব স্যার, মোস্তফা স্যার। মোস্তফা স্যার করাতেন অঙ্ক আর মাহবুব স্যার ইংরেজী। আমি খালি ভাবতাম স্যাররা এত জানেন, আমি কি কোনদিন তা শিখে উঠতে পারব? মাহবুব স্যারের ইংরেজী গ্রামারের টেন্স-এর নিয়ম শুনে আমি শুধু ভাবতাম এমন কি কোনদিন হবে না যে আমি সব নিয়ম শিখে ফেলব আর মাহবুব স্যারকে এসে তাক লাগিয়ে দেব? গরমের ছুটিতেও বৃত্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং ক্লাশ করতাম আমরা। টিনের চালের নীচে গরম লাগত কিনা তা আর আজ মনে নেই। তবে মনে আছে মাঝে মাঝে ক্লাশের পরে টিসাদের বাড়ি যেতাম । ভিসি চাচার বাসার পাশেই মেহেদী আর টিসাদের বাড়ি। টিসার আব্বা ফারুক চাচা আমাদের দেখলেই ইংরেজী গ্রামার জিজ্ঞাসা করতেন । কী ভয় যে পেতাম । চাচা আজ নেই । চাচার মুখটা শুধু চোখে ভাসে । ভিসি চাচার বাড়ি আর টিসাদের বাড়ির মাঝের গলিটায়  সবুজ দূর্বা ঘাস। সেদিন রীপা বলছিল, ‘মনে আছে রমা, আমরা কেমন স্যান্ডেল হাতে নিয়ে খালি পায়ে ঘাসের উপর হাঁটতাম?’ মনে আবার থাকবে না? মানুষ অনেক বড় হয়ে যায় । কিন্তু ছেলেবেলার কোমলতা ভুলতে পারে না। কে কবে পাশে বসিয়ে আলতো করে পায়ে আলতা পড়িয়ে দিয়েছিল। কার সাথে যেন ঘাসের উপর শুয়ে আকাশের মেঘের ভিতর নরম তুলতুলে খরগোসের ছবি দেখেছিলাম। লাল, হলুদ আর সাদা দিয়ে স্পাইরালের মত করে রং করা ললিপপ খেতে খেতে রাস্তা ধরে বন্ধুদের সাথে হেঁটে গিয়েছিলাম। সেইসব দিনে মনে প্রাণে বিশ্বাস হত জীবনটা জটিল নয়, জীবনটা শন পাপড়ির মত মুখে দিলেই জিহবার নীচে নরম হয়ে মিলিয়ে যাওয়ার । জীবনটা ভালোবাসবার।
টিসাদের বাড়িতেই আমি প্রথম ফাইবার অপটিকের ল্যাম্প দেখি । কি যে সুন্দর আলোর ফোয়ারার মত ঝরে পড়ছে । সাদা, নীল, হালকা লাল। একটা মাথা ভেঙ্গে ফেললে ছোট হয়ে যাওয়া অংশ থেকেই আবার আলো ঝরছে । আলো ভোলা যায় না।
আর মেহেদীর কথা কি বলব? আমি তো সব ক্লাশেই ফার্স্ট হই। কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষার টেস্টে মেহেদী চার নাম্বার বেশি পেয়ে ফার্স্ট হল । আমি তো স্কুলের এসেম্বলীতে সে রেজাল্ট শুনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম। রিক্সা করে কোনমতে বাড়ি নিয়ে আসা হল। শাওন শুনে বলল, ‘The queen has lost her crown.’ আর আমার নিজের দাদুভাই কোনরকম সহানুভূতি না দেখিয়ে বলল, ‘কেন, মেহেদী কেন ফার্স্ট হতে পারবে না? তুই ই খালি ভাত খাস? ও কি ঘাস খায়?’ নিজ বাড়ির লোকেরা এক দলে থাকবে সেটাই আশা করা উচিত নয় কি? না, যুক্তির ছড়াছড়ি।
মনে পড়ে অনু স্যার, মোস্তফা স্যার, মানিক স্যার, ভদ্র স্যার, গাফ্‌ফার স্যার, মাহবুব স্যার, মনিমুল হক স্যার, পরেশ স্যার, পেশকার স্যার, আজিজ স্যার (পিটি স্যার), ফেরদৌসি আপা, আসিয়া আপা, হাফিজা আপা, আম্বিয়া আপা, রুনু আপা, ফালাক বানু আপার কথা। আর স্কুলের পিয়ন গৌরদা।
যখন স্কুলে পড়তাম তখন মনে হয় স্যার আপারা তাঁদের তিরিশের কোঠায় ছিলেন। মনের ভিতর তাঁদের সেই বুদ্ধিদীপ্ত, অল্প বয়সটাই গেঁথে আছে। তার পর প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর কেটে গেছে। জানি এখন ওঁনাদের দেখলে আমার বুকের ভিতরটা ধক করে উঠবে। কোন কথাই হয়ত বলতে পারব না। সবাইকে তো দেখতেও পাব না। সেদিন চুমকি বলল জানিস আমাদের অনেক স্যার, আপারাই আর নেই। ফালাক আপা, আম্বিয়া আপা, রুনু আপা, হাফিজা আপা, গফফার স্যার...আমার পৃথিবীতে ভয় আর ভালোবাসা মনের ভিতর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে যে সব মানুষদের জন্য তাঁরা স্কুলের স্যার আর আপা । তাঁরা সারা জীবন জীবনের অংশ হয়ে হৃতপিন্ডের ভিতর বসবাস করেন ।
স্কুলের দিন একসময় শেষ হল । সমাপনীর দিন আবৃত্তি করলাম কাজী নজরুল ইসলামের সংকল্প ।
থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগটাকে, –
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে
ছুটছে তারা কেমন করে,
কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে,
কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরন-যন্ত্রণারে।।
কেমন করে বীর ডুবুরি সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে,
কেমন করে দুঃসাহসী চলছে উড়ে স্বর্গপানে।
জাপটে ধরে ঢেউয়ের ঝুঁটি
যুদ্ধ-জাহাজ চলছে ছুটি,
কেমন করে আনছে মানিক বোঝাই করে সিন্ধু-যানে,
কেমন জোরে টানলে সাগর উথলে ওঠে জোয়ার-বানে।
কেমন করে মথলে পাথার লক্ষ্মী ওঠেন পাতাল ফুঁড়ে,
কিসের আভিযানে মানুষ চলছে হিমালয়ের চুড়ে।
তুহিন মেরু পার হয়ে যায়
সন্ধানীরা কিসের আশায়;
হাউই চড়ে চায় যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিন পুরে;
শুনবো আমি, ইঙ্গিত কোন মঙ্গলহতে আসছে উড়ে।।...
রইব না কো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এ-সব ভুবন ঘুরে-
আকাশ-বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চুঁড়ে।
আমার সীমার বাঁধন টুটে
দশ দিকেতে পড়ব লুটে;
পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে;
বিশ্ব- জগ দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।।
সংকল্প তো করলাম। কিন্তু দম এদিকে বন্ধ হয়ে আসছে। সেই ক্লাশ টু তে ভর্তি হয়েছিলাম রাজশাহী ইউনিভার্সিটি এক্সপেরিমেন্টাল স্কুলে । এতদিনের স্কুল, এতদিনের ভালোবাসা, এতদিনের এত কথা সব ফেলে যেতে হবে? নীল সাদা স্কুলড্রেস পড়ে আর এখানে আসা হবে না। আমার পথের বাঁকে এখন অন্য পথ এসে মিশেছে। সেই নতুন পথ দিয়ে আমি হেঁটে যাব । কুমির তোর জলে নেমেছি...’ ‘এল ও এন ডি ও এন, লন্ডন...’ ‘টি টি টি তোমার কিরণ চাই...ধীরে ধীরে সব পিছনে মিলিয়ে যাবে।
স্কুলের সমাপনী সভায় আমায় বক্তৃতা দিতে বলা হল। খুব কিছু বলতে পারলাম না। গলার কাছে এতগুলো বছরের সব দিন একসাথে ভিড় করে একটা দলা পাকিয়ে উঠল। কোনমতে শুধু বললাম, ‘রাতের সব তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে।



তথ্যসূত্রঃ



 (চলবে)

Comments